নতুন মাত্রা পত্রিকার অনলাইন ভার্সন (পরীক্ষামূলক সম্প্রচার)

 ঢাকা      বৃহস্পতিবার ৩০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

একাত্তরের সেই যুদ্ধের কথা —– নজরুল ইসলাম

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ১০:৫৯ অপরাহ্ণ , ৬ জুন ২০২১, রবিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 3 years আগে

একাত্তরের সেই যুদ্ধের কথা
—– নজরুল ইসলাম

মহান মুক্তিযুদ্ধ আমার জীবনের এক স্বর্ণালী অধ্যায়। একটি মুক্ত স্বাধীন দেশের জন্য একজন যোদ্ধা হিসেবে ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের স্মৃতিগুলো এখন বারবার মনে ভেসে ওঠে। যুদ্ধের প্রতিটি অধ্যায়ে আমার সাথী বীর-মুক্তিযোদ্ধাদের মুখ গুলো ভুলতে পারিনা।

পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকদের শাসন শোষণ, অত্যাচার নিপীড়ণ, বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, আন্দোলন সংগ্রাম, জেল জুলুম হুলিয়া অবশেষে নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর হানাদারের আক্রমণ, পরে প্রতিরোধ যুদ্ধ, নয় মাসের সেই মহান মুক্তিযুদ্ধ সবই যে আমার চোখে জ্বলজ্বলে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। যা মনে হলেই মনে ভিন্ন অনুভুতি সৃস্টি করে।

এখন স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের বীরত্বের গৌরবোজ্জ্বল স্মারক লাল-সবুজ পতাকা দেখলে বুকটা গর্বে ভরে যায়। এই বীরত্বগাঁথার সঙ্গে সম্পৃক্ততায় নিজেকে ধন্য মনে করি। আমি সব সময়ই গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন আমাদের নেতৃবৃন্দকে, বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে। পানি ছাড়া মাছ বাঁচেনা, তেমনি মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মুক্তিকামী জনগণ ছাড়াও আমাদের বিজয় হতোনা। যুদ্ধকালীন সময়ে এ জাতির আবাল বৃদ্ধ বনিতা যাঁরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেছেন তাঁদেরকেও গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।

আমি যাঁদের সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ করেছি সহযোগী সাহসী সেই রণাঙ্গনের সাথী বন্ধু ,প্রেরণাদাতা, প্রশিক্ষণদাতা, কমান্ডার,সহযোদ্ধা সবার-সবার কথা খুব মনে পড়ে। যাঁরা বেঁচে নেই সেই বীর শহীদদেও প্রতি শ্রদ্ধা সবসময় মনে প্রাণেএবং যাঁরা বেঁচে আছেন এ জাতির অহংকার গাজী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভিনন্দন।

আমি অত্যন্ত আনন্দিত মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী এবং বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের ধারায় সারাবিশ্বে চমক সৃষ্টি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে বর্তমান সরকার যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান সরকারের সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা সবচেয়ে বেশী সম্মান স্বীকৃতি মর্যাদা পেয়েছে,এ জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সহ সংশ্লিস্ট সকলের প্রতি রইলো প্রগাঢ় কৃতজ্ঞতা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সোনালী স্মৃতিতে মাঝে মাঝে হারিয়ে যাই। সেই স্মৃতি ভেসে উঠলে প্রতিটি ঘটনা খুব কাছেরএবং আপন মনে হয়। অসীম সাহসিকতা আর দেশ প্রেমের মমত্ববোধে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা অর্থাৎ সে সময়ের তরুণ যুবারা যে অসীম সাহসিকতা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা বিরল। নতুন প্রজন্ম অর্থাৎ আমাদের আগামীর সন্তানদের জন্য আমরা মরণপণ যুদ্ধ করেছি। আমাদের সন্তানরা স্বাধীন সমৃদ্ধ দেশে তাদের মেধা বিকাশ ঘটিয়ে সারা বিশ্বে দেশকে মর্যাদায় পরিচিত করবে সেই স্বপ্ন নিয়েই আমরা যুদ্ধ করেছিলাম।

যে জাতি তার ইতিহাস জানে না, সে জাতি অগ্রসর হতে পারে না। দেশ ও জাতির জন্য যাঁদের অবদান তাঁদের স্মরণ করলে প্রেরণার সৃস্টি হয়। সে প্রেরণায় এগিয়ে যাওয়ার সাহস সঞ্চার হয়। সেই সাহসেই হয় জয়। “জয়বাংলা, বাংলার জয়” এই ঐতিহাসিক শ্লোগান আমাদের উজ্জীবিত করেছে , এখনও জয়বাংলার ধ্বনী মনে আলোড়ন সৃস্টি করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় চিতিয়ে উঠে বুক। আমাদের সাহসের কথা, আমাদের ত্যাগের কথা, দেশের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণ বিসর্জনের কথা নতুন প্রজনের জানা প্রয়োজন, কি করেছি আমরা। মহান মুক্তিযুদ্ধে নানা ত্যাগ তিতিক্ষা ছিল, রক্ত প্রাণ গেছে, কিন্তু এখন আর সেই ত্যাগের প্রাণের বিসর্জন দেয়ার প্রেক্ষাপট নেই। এখন স্বাধীন দেশ, এখন তরুণ যুবাদের আর রক্ত প্রাণ দিতে হবে না, শুধু মেধা প্রজ্ঞায় দেশকে সুন্দর ভাবে গড়তে হবে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাই নতুন প্রজন্মকে প্রেরণার জন্য আমার যুদ্ধকালীন কিছুকথা তুলে ধরার প্রয়াস করছি। বয়সের কারণে নানা স্মৃতিভ্রম আছে, মনের ভাব লেখায় প্রকাশ করতে নানা ভুল থাকতে পারে তবু যত টুক মনে পড়ে তাই তুলে ধরছি।
আমি নজরুল ইসলাম, আমার পিতা হাজী মোঃ ইয়াসিন এবং মাতা কামরুন্নেসা। আমার ভাই বোনদের মধ্যে সবার বড় বোন উম্মে কুলসুম,তারপর ভাই ড. গোলাম মোস্তফা, পওে আমি নজরুল ইসলাম, পরে মাজেদুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম সোলায়মান, বোন আবেদা ও সবার ছোট সাজেদা। ১৯৪৫ সালের ১২ মার্চ ঢাকার দক্ষিণ যাত্রাবাড়িতে আমার জন্ম। পড়া লেখা শুরু দোলাইরপাড় উচ্চ বিদ্যালয়ে, পরে নরসিংদীর কালিকুমার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে মেট্রিক, ১৯৭০ সালে কায়েদে আজম কলেজ বতর্মানে যা সরকারী শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে আই,এ পাস করি। সংক্ষিপ্তসারে আমি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে, ১৯৭১ সালের মে মাসে ভারতের ত্রিপুরা যাই সেখানে ট্রেনিং শেষে মুক্তিযুদ্ধের ২ নং সেক্টরের অধীনে যুদ্ধকালীন সময়ে “ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন” – এর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করি। গেরিলা,এবং সম্মুখযুদ্ধ সহ ঢাকায় বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিয়েছি।
পাকিস্তানী শাসকদের নানা দুঃশাসন সবসময়ই মনে পীড়া দিয়েছে। প্রতিবাদে মন বিক্ষুব্ধ হয়েছে। ১৯৭১ এর পূর্ববর্তী সময়ে পাকিস্তানীদের সাথে অসহযোগ আন্দোলন সংগ্রাম, গণঅভুত্থান, বিশেষ কওে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হলে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছি।
বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মাচের ভাষণের সময় আমি ছিলাম রাজশাহীতে। সেখানে থেকে ৮ ই মার্চ রেডিওতে এই ভাষণ আমরা শুনি। সেই কি ভাষণ, প্রতিটি শব্দ মনের মাঝে আলোড়ন সৃস্টি করেছিল। মহান নেতা জাতির জনক যখন বলছিলেন, আমাদের যার যা কিছু আছে,তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, তোমরা প্রস্তুত থাক, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দিব, তবু দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম -মুক্তির সংগ্রাম, জয়বাংলা। সেই ভাষণ আর সেই তেজদীপ্ত শ্লোগানে মনে ঝড় উঠে, সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মতো গর্জে উঠি তখন, জয়বাংলা ধ্বনীতে। যুদ্ধেও প্রস্তুতি মনে ভিত্তি সৃস্টি করে। আমরা তখন প্রতিদিনই ঢাকার খোঁজ খবরের অপেক্ষায় থাকি। তবে যে দিনের ঘটনা পত্রিকায় পেতাম তা একদিন পর। রেডিওর পাশে বসে থাকতাম,নতুন কিছু বলে কিনা। রাজশাহীতে তখন স্থানীয় যুবকদের সাথে নিয়ে আমরা নানা শলা-পরামর্শ করতে থাকি, আমাদের কি করণীয়,আমরা কি করবো। ২৭ মার্চ দুপুর বেলা আমরা বোস পাড়ায় তেমনি যুবকদের নিয়ে বসাছিলাম, তখন একজন পুলিশ সদস্য সেন্ডো গেঞ্জি খাকি প্যান্ট পড়ে সাইকেল দিয়ে আমাদের কাছে এসে বলে, আমরা পাঞ্জাবীদের সাথে বিদ্রোহ করেছি। আমাদের রেশন বন্ধ করে দিয়েছে , পুলিশ লাইনে বাঙ্গালী পুলিশ আমরা দুইদিন যাবৎ অনাহারে আছি , আমাদেও খাবার পাঠান। তখন আমরা সেখানকার উঠতি ছেলেরা মিলে বাড়ি বাড়ি থেকে খাবার সংগ্রহ করে পুলিশ লাইনে পাঠালাম। সেই দিনই দুপুরে ভারতের আকাশবাণীতে একই শিল্পীর আসরে চলছিল গান, একটি গানের পরেই শুনতে পাই ,একটি বিশেষ ঘোষণা ,“আমি দেব দুলাল বন্দোপাধ্যায় বলছি, ঢাকায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ঢাকার সাথে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।” আমরা তখন কি করবো দিশেহারা। এমন সময় রাজশাহী রেডিও ওপেন হয়। সেখানে শুনতে পাই বিশেষ ঘোষণা , যার যা বৈধ অস্ত্র নিকটস্থ থানায় জমা দেন। এ খবর শুনতে পাওয়ার পথে দেখি ৬ জন লোক (বিহারী) ৬ টি বন্ধুক আর একটি পয়েন্ট টুটু রাইফেল আর কিছু গুলি নিয়ে পান খেয়ে হাসতে হাসতে থানার দিকে যাচ্ছে, আমরা যুবকরা তখন তাদেরকে পথে থামিয়ে দেই, এবং ধমক দিয়ে তাদেও কাছ থেকে অস্ত্র গুলো ছিনিয়ে নেই, তারা ভয়ে সে গুলো আমাদের কে দিয়ে বলে লে- বাবা -লে, আমাদের যুবকদের মধ্যে আমি ছাড়া কেউ অস্ত্র চালাতে পারে না। কেননা আমার মামা আব্দুর রশিদ সাহেব শিকারী ছিলেন , উনার সাথে আমি শিকারে গিয়ে বন্ধুক ও টুটু রাইফেল চালানো শিখেছিলাম। ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্র গুলো কিভাবে চালাতে হয় সাথের যুবকদের অল্পসময়ের মধ্যে শিখিয়ে দেই। এদিকে আমার চাচা হাজী আমির হোসেন সাহেব রাজশাহীর স্বনামধন্য একজন প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার ছিলেন, তিনি আমাকে এবং আমার চাচাতো ভাই শাহজাহান ও বাবুল কে ঠিকাদারী কাজ শেখানোর জন্য রাজশাহীতে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাজশাহীতে যাবার পর সেখানকার যুকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব সৃস্টি হয়ে যায় , আমি ঢাকার ছেলে এ জন্য তারা আমাকে খুব মানতো। আমরা খবর পাই রাজশাহী পুলিশ লাইনে বিদ্রোহ হয়েছে। এবং পুলিশ লাইনে পাঞ্জাবী আর্মি বাঙ্গালী পুলিশদের নিরস্ত্র করে হত্যা করছে । খবরটা জেনে আমরা রাজশাহীর লক্ষীপুরে অবস্থিত পুলিশ লাইনের দিকে বাঙ্গালী পুলিশদের সহায়তার জন্য রওয়ানা হই। আমরা কজন যুবক মিলে ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্র গুলো নিয়ে রাজশাহী পুলিশ লাইনের দিকে রওয়ানা হলাম, পাঞ্জাবীরা বাঙ্গালীদের মারছে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজশাহীর বাঙ্গালী জনতা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে।আমরা যুবকরা মিলে রাজশাহী পুলিশ লাইনে যাই ,গিয়ে দেখি নৃসংশ ঘটনা, মাথায় গুলিতে নিহত অনেক লাশ, মাঝে মাঝে গুলি হচ্ছে, কোথা থেকে গুলি আসে তা বুঝা যায় না। দেখি মাথা উচ ুকরলেই গুলি লাগে। দূর থেকে এসব দেখে পাশের পদ্মা নদীর তীর দিয়ে ক্রলিং করে সন্ধ্যার সময় সেখান থেকে আমরা চলে আসি। পুলিশ লাইন নৃশংতার পর রাজশাহীতে পাকিস্তানী আর্মিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিযান চালায়,তারা নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। পাকিস্তানী আর্মিরা বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে আওয়ামীলীগের বড় নেতা , বেশ কিছ ুহিন্দুদের বাড়িতে হানা দিয়ে তাদের হত্যা করে। রাজশাহীতে আমাদের বাড়িতেও আর্মি ঢুকে। আমরা বাড়ি ছিলাম না। আমাদের বাড়ি তছনছ করে। আওয়ামীলীগের যারা ভালো ডোনার ছিল, আওয়ামী লীগকে চাঁদা দিত, সাহায্য দিত, তাদের এসে আর্মিরা খোঁজ শুরু করে। আমার চাচা মরহুম আমির হোসেন আওয়ামীলীগের ডোনার ছিলেন, তাই চাচার বাড়ি তছনছ হয়।
এসব ঘটনায় , আমার ফুফু এসে বল্ল, তোদের এখানে রাখা ঠিক হবে না। কারণ, তোরা যে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছিস, সেটা ওরা জেনে গেছে। ঢাকায় চলে যা। আমাকে টাঙ্গা গাড়ির মাঝখানে বসিয়ে মাথায় পট্টি দিয়ে তুলে দিল, আর আমার চারপাশে বাচ্চাদের বসিয়ে দিয়ে আমার ফুফু আমাকে শহর থেকে বিদায় দিলেন। তারপর কিছু হাঁটি, কিছু টাঙায় চড়ি। এ সময়ে পাকিস্তানী যুদ্ধ বিমান আকাশে টহল দিচ্ছিল। আর ইপিআর সদস্যরা সেই বিমানের দিকে লাইট মেশিনগান দিয়ে গুলি ছুড়ছিল। সেখানে এক ইপিআর-এর অফিসারের কাছে আমি পরিস্থিতি জানতে চাইলাম , তিনি বল্লেন, সব বাঙ্গালী যারা ব্যারাকে ছিল,পাঞ্জাবিরা তাদের অস্ত্র নিয়ে যাচ্ছে এবং বাঙ্গালীদের বন্দী করছে। আমরা যারা বর্ডার ডিউটিতে ছিলাম তারা কেউ অস্ত্র জমা দেই নাই, ব্যারাকে হাজির হই নাই। আমরা বিদ্রোহ করেছি। অফিসারের কথা শুনে খুশী হলাম, মনে অনেক সাহস হলো। আমরা রাত আটটার সময় পাবনা আসলাম। বিদ্যুৎ নাই, অন্ধকার দলে দলে লোক একটি মাঠে যাচ্ছে আসছে। আমরা মাঠের দিকে গেলাম , গিয়ে দেখি মাঠে ১৪ জন পাঞ্জাবীর লাশ একটার পর একটা স্তুপ করে রেখেছে। বাঙ্গালী ইপিআর পুলিশ ও ছাত্র-জনতা মিলে তাদের মেরে ফেলেছে। সেখানে আমার এক চাচা নাজমুল হুদা (চলচ্চিত্র ও নাট্যাভিনেতা) বাসায় রাত কাটালাম। আমরা ছিলাম অনাহারে। তারপর ভোর বেলা রওয়ানা দিয়ে নগরবাড়ি ঘাটে এলাম। সেখানে দেখি আমাদের মতো বয়সের কিছু ছেলে হাতে বন্ধুক নিয়ে ডিউটি করছে। আমাদের জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাবেন। বল্লাম, ঢাকা যাব আরিচা হয়ে। তখন নদীর পাড়ে অস্থায়ী হোটেল বসেছে,ওখানে চার আনা করে খাবার দেয় পানি সহ ছোট ছোট চিংড়ি মাছের ঝোল ও ভাত। এসব খেয়ে রওনা হলাম এবং জনপ্রতি দেড় টাকা দিয়ে নদী পার হয়ে আরিচা এলাম। তারপর ওখান থেকে আমরা কিভাবে আসবো! সন্ধ্যার সময় কার্ফু হবে। এমতাবস্থায় ঢাকা যাওয়ার গাড়ি খুজি , কিন্তু টেক্সি গাড়ি ভাড়া জনপ্রতি ৫ থেকে ৭ শ টাকা চাইছে। এমন সময় একটি ছেলে অল্পবয়সি ড্রাইভার বলল,” আমি পল্টন যাবো,স্যারের (গাড়িরমালিক) বাসায়। স্যার তো বগুড়ার লোক। স্যারকে আরিচা নামিয়ে দিয়েছি। আমার সাথে আপনারা ঢাকায় যেতে পারেন”। বলল, একটু খেয়ে নেই। এদিকে গাড়িটিতে কারা যেন সাইলেন্সার বক্সেও মধ্যে ন্যাকড়া ঢুকিয়ে রেখেছিল। আমরা বুঝি নাই। এরপর যখন নয়ারহাটের কাছাকাছি আসি,তখন গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। ভাগ্য ভাল তখন আমরা ইপিআরটিসি’র একটি বাস পেয়ে গেলাম। গাড়িতে লাকড়ি বোঝাই। আমরা দুইভাই, চাচাতো ভাই -বাবুল- গাড়ি থামালাম এবং বললাম, আমরা ঢাকা যাব। ড্রাইভার বলল, আমি ঢাকায় যাব না। মিরপুর ব্রিজের এপার নামিয়ে দিতে পারব। ভাবলাম, মিরপুর নামতে পারলে পাশের গ্রামে আশ্রয় নিতে পারব। ও বলল, “ওপারে ভয়ানক অবস্থা, বাঙ্গালী মানুষ দেখলেই মেরে ফেলে”। পরে আমাদের নামিয়ে দিলে আমরা ব্রিজটার কাছাকাছি গেলাম। দুটো স্কুটার এলো। ৪/৫ জন যাত্রী নামিয়ে দিল। আমাদের একটা স্কুটার জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাবেন ? বললাম যাত্রাবাড়ি এবং জিজ্ঞেস করলাম কত নিবেন? বলল, আগে বসেন তাড়াতাড়ি, কার্ফু পড়ার সময় বেশি নাই। আসার সময় দেখলাম অনেক অনেক লাশ, কুকুর খাচ্ছে, শুকুনে খাচ্ছে। পাঞ্জাবীরা মাঝে মাঝে গাড়ি চেক করছে কিন্তু আমাদের গাড়ি চেক করে নাই। আমাদেও বয়স কম ভেবে হয়তো গাড়ি চেক করে নাই। অবশেষে ড্রাইভার আমাদেও নামিয়ে দিলেন। টাকা দিতে চাইলাম। টাকা নিলো না। বললো, “থাক আপনারা ছাত্র মানুষ। আমি কলতাবাজার যাব”। অবশেষে বাড়িতে পৌছলাম। বাড়ি পৌছতেই মা চাচীরা আমাদের দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে বাড়িতে ঢুকালেন। মা চাচীরা মনে করেছিল আমাদের মেরে ফেলা হয়েছে,জীবন্ত দেখে আমাদের পেয়ে এ গোসল করিয়েছে। পরে কিভাবে আসলাম খবর নিল। আমিও ঢাকার অবস্থা জানলাম। তখন এপ্রিলের শুরু ঢাকায় কারফিউ চলছে। মাঝে মধ্যে দুই তিনঘন্টার জন্য কারফিউ শিথিল করে। আমরা তখন পাড়ার যুবকরা একত্রিত হওয়ার চেস্টা করি। এবং বেশ কজন জড়ো হয়েছিলাম, তখন কি করবো এ জন্য। এ সময় যারা ছিলেন তারা হচ্ছেন আমিন লস্কর, ফজলুভাই, আলমাস ভাই,করিম ভাই, নাজিমুদ্দিন, মতিন,দবির, আশরাফ সহ মহল্লার ১৫/ ১৬ জন। তখনের একটি ঘটনা। আমার বন্ধু আমিন লস্করের এপেন্ডেসাইটিস এর অপারেশন হবে , রক্তের দরকার, আমরা বন্ধুরা নাজিমুদ্দিন,দবির, আশরাফ, ইকবাল সহ অনেকে তখন রক্ত দেয়ার জন্য মিটফোর্ড হাসপাতালে গেলাম। হাসপাতালে গিয়ে দেখি রোগীদের ভীড়, বেশীর ভাগ পুলিশ সদস্য, তারা প্রায় সবাই গুলিতে আহত। তাদের কাছে জানলাম তারা কেউ বংশাল ফাঁড়ির, কেউ রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সদস্য। এরমধ্যে বেশ কজন মারাও গেছে। এ পরিস্থিতিতে আমরা রক্ত দিতে পারলাম না। কারণ ডাক্তাররা ছিলনা, যাত্রাবাড়ি ফিরতেই শুনি গুলিরশব্দ। পাঞ্জাবিরা গুলি করছে। আমার মামাতো ভাই আবদুর রহমান পাহলোয়ানের পেটে ৫ টি গুলি লেগেছে। রহমান ভাই বল্লেন, পুকুরঘাটে যাও সেখানে আলমাস পড়ে আছে। আমরা পুকুরঘাটে গিয়ে ৫ টি গুলিবিদ্ধ এবং গুরুতর আহত আলমাস ভাইকে উদ্ধার করি এবং হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করার ১০ দিন পর তিনি শহীদ হন। এদিকে আবদুর রহমান পালোয়ান ভাই ৩ মাস হাসপাতালে থেকে সুস্থ হয়ে বাড়িতে আসে। এপ্রিল মাসে জিঞ্জিরাতে পাকিস্তানী আর্মিরা অনেক লোক মেরেছে। আমি, দবির,নাজিমউদ্দিন গেলাম জিঞ্জিরা দেখতে। আমরা ভুল করে শাঁখারীবাজারের দিকে গেলাম। সেখানে আর্মিরা আমাদেও হল্ট করল, জিজ্ঞেস করল, ‘কি ধার যানা হ্যায়?’ বললাম ইধার যানা হ্যায়। বলল, “যাও”। আমরা সদর ঘাটদিয়ে নৌকা নিয়ে জিঞ্জিরা গেলাম। গিয়ে দেখি শুধু ধোঁয়া, ছাই। কিছু মানুষ বিলাপ কওে কান্নাকাটি করছে। এগুলো দেখে আমরা পো¯তগোলা দিয়ে নদী পার হয়ে চলে আসছি,আমরা চিন্তা করি, কিভাবে প্রতিশোধ নেওয়া যায়। আমাদের ভেতরে প্রতিশোধের আগুন।
এছাড়া আমরা তখন স্কুল কলেজ এবং মহল্লার বন্ধুরা এক সাথে দলবল নিয়ে চলতাম। আমার দুই ক্লাসমেট দবিরউদ্দিন ও সিরাজ। আমরা সব দেখে ভাবছি কি করব! ওরা (পাকসেনা) বাড়িতে বাড়িতে এসে যুবকদের মেরে ফেলে আর যুবতীদের ধরে নিয়ে যায়। আমার ক্লাসমেট এবং দনিয়ার পূণ্যবাবুর ছেলে পান্নার বোন ও ভাতিজিকে নিয়ে গেল শ্যামপুর তেলকল আর্মি ক্যাম্পে, পরদিন খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেল মেয়ে দুইটির লাশ নদীতে ভাসতেছে। দিনদিন পাকিস্তানী হানাদাররা অত্যাচার বেশী শুরু করলো, আমরা কি করব কোন দিক পাচ্ছিনা এর কিছুদিন পর শুনি রূপগঞ্জের বরপায় মুক্তিবাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং ব্রিজ ভেঙে দিয়েছে। এর মানে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। ঠিক করলাম,আমরা যুদ্ধে যাবো। যাত্রাবাড়ি ওয়াপদার নিরিবিলি মাঠে আমরা ২০/২৫ জন বসতাম। আমরা প্রায়শ বিকেলে সব যুবক মিলে মিটিং করি, কিভাবে কি করা যায়। আমরা একদিন কমলা পুওে যাই, সেখানে গিয়ে মিটিং করি । মিটিং এ ছিলো হানিফ, জিন্নাহ, আবুল হোসেন, আমার ক্লাশ ফ্রেন্ড মেসবাহ উদ্দিন সাবু, বন্ধু পপ গায়ক আজম খান, ফুয়াদ, ভুলু, নিলু খগেন্দ্রনাথ (খগা) সহ বেশকজন। লাস্ট মিটিং করি কমলাপুরের মধুমিতা ও মনমিতা নামে দুইটা হোটেল ছিলো সেখানে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সবাই যুদ্ধের জন্য ট্রেনিং নেবো, শুনলাম নরসিংদীতে ট্রেনিং হয় সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্তহলো। আমরা যাওয়ার দিন তারিখ ঠিক করলাম। পরে জানলাম নরসিংদীতে ট্রেনিং হয় না ট্রেনিং হয় ভারতের আগরতলায়, আমরা আগরতলা যাবার সিদ্ধান্ত নেই এবং যাত্রাবাড়ি আরকে চৌধুরীর সাহেবের বাড়ির পিছনে একত্রিত হবো বলে প্লান করি। কিন্তু এরই মাঝে খবর পাই আলমাস ভাই মারা গেছেন । আলমাস ভাইকে সকালে কবর দিলাম। পরে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য মন স্থির করে মার কাছে অনুমতি নিলাম, মা বল্লেন “যাও আল্লাহ ভরসা”। মাকে সালাম করে , যাত্রাবাড়ি আর কে চৌধুরীর বাড়ির পেছনে জড়ো হই। আমি, হানিফ, জিন্নাহ, আবুল হোসেন এ কজন। সিদ্ধান্ত নরসিংদী যাব। দবির আর মতিন আমাদের বাসে উঠিয়ে দেয়। আমরা চারজন নরসিংদীর বাসে চড়লাম। বাসে একজন মুরুব্বী আমাদের দেখছিলেন একসময় কাছে এসে আমাদেও বললেন,”বাবা তোমরা নরসিংদী পর্যন্ত যাইও না। তোমরা একটু আগেই নেমে পড়ো। চেক হবে। তোমাদের যে বয়স, সমস্যা হবে”। তখন আমরা নরসিংদীর অল্পআগেই নেমে গেলাম। ঐ মুরুব্বী আমাদেও ডিরেকশন দিয়ে দিলেন এবং বললেন যুবকদের পাড় করার জন্য সেখানে একটা ছোট লঞ্চ আছে,লঞ্চ পর্যন্ত হেঁটে যাও। গাড়িতে যাবে না। গাড়িতে গেলে ওরা চেক করবে। আমরা ওখানে গিয়ে লঞ্চে চড়লাম। লঞ্চে নদী পাড় হলাম। লঞ্চে আমাদের কাছ থেকে কোন ভাড়া নেয়নি। এবং যারা ছিল তারা বলে দিল,আমরা কিভাবে কোথায় যাব। আমরা কিছু দূও যাওয়ার পর সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় একটা হিন্দু বাড়িতে গেলাম। তখন আমরা সব সময় হিন্দুবাড়িকে প্রাধান্য দিতাম। কারণ, তারা বিট্রে করবে না। সেখানে, একটি হিন্দু বাড়িতে যাওয়ার পর তারা আমাদেও সম্পর্কে জানলো। তারা আমাদের চিড়া মুড়ি খাওয়াল। ওখানে রাত্রে ৪ জনের মধ্যে একজন জাগি,তিন জন ঘুমাই, আবার একজন জাগি বাকি তিনজন ঘুমাই। এভাবে রাত কাটে। ভোর না হতেই আলো আঁধাওে আমরা তাদের দেখানো পথে হাঁটা শুরু করি। কিছু কাঁদা-মাটি, কিছু শুকনা, কিছুটা পানির পথ এবং এলাকাবাসীর কাছে বলে বলে আমরা দুদিনে আগরতলা গিয়ে পৌঁছলাম। আমি, জিন্নাহ, আবুল হোসেন ও হানিফ আমরা চার বন্ধু প্রথম আগরতলা কলেজ টিলায় যাই, সেখানে গিয়ে দেখি অনেক মানুষের ভীড়। আগরতলা গিয়ে দেখা হলো গাজী গোলাম মোস্তফার সাথে। তিনি নরসিংদীর খ্যাতনামা আওয়ামীলীগ নেতা ও সংগঠক। এছাড়া কলেজটিলায় আমাদের পরিচিত বন্ধুবান্ধব অনেকের সাথে দেখা হয়। তাদের কথায় আমরা মতিনগর ক্যাম্পে যাই। তখন আমাদের পরিচয় জানতে চাইলে বলি ঢাকা যাত্রাবাড়ি থেকে এসেছি। সেই ক্যাম্পে তখন ২ নং সেক্টরের উপ অধিনায়ক ক্যাপ্টেন এটিএমহায়দার সাহেব ঢাকার ছেলেদের খুজছিলেন। অরজিনাল ঢাকার পোলাপান, ঢাকায় বসবাস করে এমন, মানে ঢাকাইয়া। আমাদের পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন। তিনি আমাদের চিনলেন এবং আমাদের মতিনগরে গ্রেনেড বিষয়ে প্রাথমিক ট্রেনিং দিলেন। আমাদের ট্রেনিং দিয়ে প্রথমবার জনপ্রতি ২ টি করে গ্রেনেড দিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। বলেন যে, তোমরা শুধু ঢাকার শহর গরম রাখবা। এটা দিয়ে প্রমাণ করবা যে, ঢাকায় প্রতিরোধ আছে বা হচ্ছে। ঢাকায় এসে আমাদের কাজ ছিল শত্রুদের আড্ডায় গ্রেনেড ছুড়া। আমরা ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় গভর্ণর হাউজের গেইটে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের চত্বরে, সেখানে ঝাউগাছ ছিল, এছাড়া কমান্ডার চুলাফ্যাক্টরীর সামনে দুইটা, হামিদুল হক চৌধুরীর প্রেসের সামনে , কমলাপুর ,যাত্রাবাড়ি ,পোস্তগোলা জুরাইনের বিভিন্ন জায়গায় গ্রেনেড ছুড়ি, সন্ধ্যা হলেই দুটো- হোন্ডানিয়ে ৪ জনে গ্রেনেড মারতাম। আমার সাথে ছিল হানিফ, জিন্নাহ ও আবুল হোসেন। আর তখন মানুষজন কম ছিল তাই সহজেই পালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। ট্রেনিং এ আমাদের বলেই দিয়েছিল, হিট অ্যান্ড রান, মারবা আর পালাবা, ধরা পড়বা না ,এছাড়া বলে দিয়ে ছিলো “কোন নিরীহ লোক যেন তোমাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।” আমরা তিন চারদিনের মধ্যেই গ্রেনেড শেষ করে আবার ফিরে গেলাম আগরতলায়। দ্বিতীয়বার যখন গেলাম তখন মতিনগর আর ক্যাম্প ছিল না। এটা চলে গেল মেলাঘরে। মেলাঘরে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখা হলো শহীদুল্লাহ খান বাদল ভাইয়ের সাথে,ক্যাপ্টেন হায়দার ভাই এবং বাদল ভাই আমাদের নিয়ে গেলেন সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ সাহেবের কাছে। তিনি আমাদের নাম পরিচয় জানলেন এবং খুশীও হলেন। সেখানে আমরা ১৮ দিন ট্রেনিং নেই। সেখানেই আমাদের সাথে দেখা হয় , আমার কলেজের বন্ধু মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ভাইয়ের সাথে, দেখা হয় গাজী গোলাম দোস্তগীর, আবু সাঈদ ভাই, সামাদ ভাই, আলম ভাই, মোজাম্মেল, আনোয়ার গিয়াসউদ্দিন সহ আমাদের তেজগাঁও থানা এলাকার অনেকের সাথে।
এই ক্যাম্পে বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসের জন্য এক্সপ্লোসিভ ট্রেনিং, স্টেনগান খোলানো-লাগানো, এস.এল. আর,থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও লাইট মেশিনগান খোলানো-লাগানো, প্রশিক্ষণ নেই। প্রতিদিন দু-বেলা ট্রেনিং হতো। দুপুরে রেস্ট। সকালে বিকালে ট্রেনিং। এক্সপ্লোসিভের ট্রেনিং আবার সবাইকে দেয় নাই। যারা লেখাপড়া জানে সাহসী, তাদেরই দিয়েছিল। ক্যাপ্টেন হায়দার ভাই ঢাকা অপারেশনের জন্য ৭ জনেরএকটি গ্রুপকরে দেন এবং নাম দেন “ম্যাগনেফিসেন্ট সেভেন”গ্রুপ। আমি ছিলাম গ্রুপের কমান্ডার। আমার টু-আইসি ছিলো ইঞ্জিনিয়ার আবুল বাশার রাজশাহী বাড়ি, জিন্নাহ, হানিফ, আবুল, ভুলু আর রূপগঞ্জের আহসানউল্লাহ। হায়দার সাহেব তাঁর নিজের লাল জিপে কওে আমাদেও সাতজনকে বর্ডার এর কাছাকাছি এনে নামিয়ে দিয়ে ছিলেন। আমরা ঢাকায় ফিরলাম, এবার অপারেশন বিদ্যুৎলাইন পানিরলাইন এবং পাকিস্তানী আর্মিদের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা। এবার এসে স্তানীয় যুবকদের কিছু ট্রেনিং দিয়ে আমার বাহিনী বড় করি। মান্ডা, কুতুবখালী, জুরাইন,মুরাদপুর,মাতুয়াইল,যাত্রাবাড়ি,মিরহাজিরবাগ,কাজলা দনিয়া প্রত্যেক এলাকার বন্ধু-বান্ধব আমরা এক হয়ে বিরাট বাহিনী গড়ে তুললাম। গ্রুপে আমার নেতৃত্বে যারা ছিল তারা হচ্ছে গ্রুপের টুআইসি ইঞ্জিনিয়ার আবুল বাশার, আহসানউল্লাহ, মোঃ হানিফ, মোঃ জিন্নাহ, মোঃ আবুল হোসেন, মোঃ রেজভি, মোঃ দবিরউদ্দিন , মোঃ আশরাফ, মোঃ সিরাজ , আব্দুল মতিন, যাত্রাবাড়ির মোঃ নাসির, হাফেজ আহসান উল্লাহ, শহীদ ফারুক, শহীদ মোজাফফ্র , নুরুল ইসলাম, সামসুদ্দিন, মোঃ ইব্রাহিম, নবু, বাবুল, সানু, সামসু, মানিক, মোঃ জয়দর আলী, মোঃ রতন , মোঃ এনামুল, মোঃ সালাউদ্দিন, মোঃ মোবারক , মোঃ হারুন, মোঃ সোলায়মান, মধু মেম্বার, আব্দুস সালাম,বংশালের আব্দুল কাদের, বংশালের নবু মিয়া, বংশালের মোঃ জিন্নাহ, বাবুলমিয়া, মোঃ আলিম, মোঃ মোনয়েম (মনা), মোঃরশিদ , মুন্সিগঞ্জেরনিলু, খগেন্দ্রনাথ খগা, বাবুল মোল্লা, কাজলার মোঃনাসির, মোঃ সুবেদ আলী, মোঃ কামিজউদ্দিন, কাজলার মোঃ শাহজাহান , মোঃ ফালু,সহীদ, মোঃ ফারুক, মোঃ লেব ুমিয়া, কবির ভুইয়া, করিম ভাই, মোঃ নাইয়ুম, আলী হোসেন , নাজিমউদ্দিন মাস্টার, মোঃ ওয়াদুদ, আলতাফ হোসেন সহ আরো অনেকে। ঢাকায় আমার বিভিন্নœ উপদল করে ভাগ ভাগ হয়ে যাই। আমরা এক সাথে সবাই থাকতাম না। কারণ ধরা পড়লে যেন এক ভাগ ধরা পড়ে। সবাই যেন ধরা না পড়ে। প্রথম দিকে আমাদেও কাছে হেভি আর্মস ছিলনা। হেভি অস্ত্রের মধ্যে ছিল স্টেনগান। পরে থ্রি নট থ্রি রাইফেল দুটি এস এল আর ইন্ডিয়া থেকে আনি। আমাদের কাছে এক্সপ্লোসিভ ছিল। আমাদের বলে দেয়া হয়েছিল কম এক্সপ্লোসিভ খরচ করে বেশি ধ্বংস করার কথা। আমরা ট্রান্সফরমার ধ্বংস করি,মান্ডা থেকে ডেমরা হয়ে ফতুল্লা হয়ে যে ৩৩ শ ভোল্ডের বৈদ্যুতিক লাইন গেছে , সে লাইনের বড় বড় মোটা খাম্বা , চারপায়া খাম্বা এবং ট্রান্সফর্মার ফেলে দেই এবং বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন করি। সন্ধ্যা হলেই আমরা এই অপারেশন চালাতাম। অপারেশনে আমাদের এক্সপ্লোসিভ শেষ হয়ে গেলে,আমরা আবার ভারত যাই।এবার আমাদের হেভি অস্ত্র দিল এলএমজি। এর মধ্যে আমাদের অনেকগুলো ছেলে ধরা পড়ে গেল। এদেও মধ্যে দবির অন্যতম। দবিরকে ওর ভাই মুনায়েম সহ ধওে নিয়ে গেল। বংশালে ও আমাদের একটা গ্রুপ ছিল। নবু, কাদির, বংশালের জিন্নাহ, বাদশা, আলিম আরো অনেক নাম এখন ঠিক মনে করতে পারছিনা তাদেরর আর্মিরা ধরে নিয়ে যায়। আমরা খবর নিলাম যে টাকা দিলে জামিন পাওয়া যায়। আমি সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ সাহেব কে গিয়ে বললাম,আমরা কিভাবে টাকা ও অস্ত্র জোগাড় করতে পারি। উনি বললেন গ্রামের থানা ও ব্যাংক লুট করো। বললাম, গ্রামে কেন শহরে লুট করা তো ইজি। উনি বললেন, না, শহরে করলে বদনাম হবে, তারা বলবে যে আমরা দস্যু। কারণ শহরে অনেক দেশী বিদেশী সাংবাদিক আছে। গ্রামে নাই। আমি আমার স্থানীয় কয়েকজন বন্ধু আশরাফ, হানিফ, খগেন্দ্র, ভুলু মিলে আমিন লস্কর, লেব ু মিয়া ও কবির ভূইয়ার সহযোগিতায় দোহার থানা সকালে রেকি করে দুপুরে আক্রমণ করি। তখন থানার অদূওে পদ্মা নদীতে আর্মির একটি ট্রলার ছিল। আমরা থানায় যারা ছিল ওসি থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সবাইকে সারেন্ডার করাই। এদিকে থানায় ঢুকেই ভুলু আমার অনুমতি না নিয়েই রেজাউল করিম আঙ্গুর নামে এক দারোগাকে গুলি করে আহত করে। আমি ভুলুকে ধমক দেই এবং তার কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে নেই। রেজাউলকে এলাকার লোকজন হাসপাতালে পাঠায়। আমরা বাকি পুলিশদেও থানার হাজতে ঢুকিয়ে তালা মেরে দেই। ওদেও কাছ থেকে মাল খানার চাবি নিয়ে মালখানায় যত রাইফেল ও গুলি আছে সব লুট করি। এত অস্ত্র নিয়ে নিলাম যে, নৌকায় আর জায়গা ছিলনা। তাই আমরা ভাল অস্ত্র গুলো রেখে পুরাতন রাইফেলগুলো ভেঙ্গে ফেলে দেই। যেন এসব খারাপ লোক বা শত্রুর কাছে না যায় সে জন্য এ গুলো ভেঙ্গে ফেলেছিলাম। আমরা নৌকায় না উঠে অস্ত্র সহ নৌকা ছোট খাল দিয়ে টেনে এবং সাতরিয়ে নিয়ে যাই হাবিব ব্যাংক পর্যন্ত। সেখানে অনেক উচু একটা টাওয়ার ছিল সেটি এক্সপ্লোসিভ এর সাহায্যে ফেলে দেই । পরে ব্যাংকে ঢুকি। টাওয়ার পড়ার শব্দে এবং আমাদের দেখে ব্যাংকের দারোয়ানসহ ব্যাংকের অন্যান্যরা পালিয়ে যায়। সেদিন ছিল রোববার, ব্যাংকে খুব বেশি টাকা পাইনি, ব্যাংকের মেইন লকার ভাঙ্গতে পারিনি। ব্যাংকে যে টাকা পেয়েছিলাম তা দিয়ে ১৭/১৮ জন ছেলেকে জামিন আনতে পেরেছিলাম।এই অপারেশনে স্থানীয় এলাকাবাসী আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছে। তাদের কাছে আমরা আজও কৃতজ্ঞ। পরে রাত সাড়ে ১২ টায় অস্ত্র বোঝাই নৌকা নিয়ে আমরা কেরানী গঞ্জের হাসনাবাদে পৌছি। সেখানে এসে আমি একা হাসনাবাদে কিছু লোকবসা দেখতে পাই । তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলছিল। এ সময় তাদের বলি। আপনারা আমাদের একটি নৌকা দেন আমরা বুড়ি গঙ্গা পাড় হবো। যা পয়সা লাগে আমরা দেব। তারা আমার কথায় খুশী হন এবং তারা একটি নৌকা দিয়ে আমাদের পাড় করে দিতে আসে ।তারা এসে নৌকায় অস্ত্র দেখে এবং খুশী বলে, আজ মুক্তিযোদ্ধাদের দেখলাম। তারা সানন্দে তাদের নৌকায় আমাদের অস্ত্র গুলোতুলে দেয় । আমাদের শ্যামপুর বালুর মাঠে পৌছে দেয় এবং তারা টাকা পয়সা কিছুই নেয়নি। থানা লুটের পরের দিন রাতে আর্মিরা আমাকে যাত্রাবাড়ি থেকে আটক করে। আমার ক্লাসমেট প্রিয় বন্ধ ুআহসান সূত্রাপুরে ধরা পড়ে, টর্চার সহ্য করতে না পেরে সে আমাদের অনেকের নাম বলে দিয়েছিল। তাই আমি ধরা পড়ে যাই, অন্যরা ধরা পড়েনি। আমাকে কোতোয়ালী সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার সাথে এলাকার পিস কমিটির কনভেনার আব্বাস সাহেবকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি পিস কমিটির হলেও তিনি আমার গ্রুপকে অনেক সহায়তা করতেন,তার বাড়িতে আমার গ্রুপের একটা ক্যাম্প ছিল।এ বাড়িতে আমাদের অস্ত্রও রাখতাম। আমাদের ধরার সময় কোন অস্ত্র খুজে নাইও তল্লাশী করে নাই ,এ জন্য আমাদের অস্ত্র গুলো সেভ হয়ে যায়।সেনা ক্যাম্পে গিয়ে সেখানে আটক দবিরসহ বংশাল ও সুরি টোলার অনেকের সাথে দেখা হয়। সেনারা সবাইকে টর্চার করে মারাত্মক আহত করে রেখেছে। সেনারা প্রতিরাতে ১০ থেকে ১২ টা পর্যন্ত আটককৃতদের টর্চার করতো। এদেও মধ্যে দবির একজন,তাকে অনেক টর্চার করে আর্মিরা।ওর শরীরে এমন কোন জায়গা বাকি ছিলনা ক্ষত ছাড়া।ওর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পোকা হয়ে গিয়েছিল। ওয়াপদাতে চাকুরী করতো চাটগাওয়ের বাচ্চু মিয়া দবিরের কাছে একটি গ্রেনেড চেয়ে বলেছিল, ওয়াপদার চারতলার ওপর থেকে সেনাদের গাড়িতে গ্রেনেড মারবে। দবির আমার অনুমতি নিয়ে একটি গ্রেনেড দেয়, বাচ্চুমিয়া এই গ্রেনেডটি চারতলা থেকে সেনাদের ট্রাকের উপর মারে । কিন্তু সেটি ট্রাকে না পড়ে ট্রাকের ১০ /১২ হাতপিছনে পড়ে। পরে বাচ্চুমিয়াকে তার অফিসের লোকজন সেনাদের হাতে তুলে দেয়। বাচ্চু মিয়া সেনা টর্চারে দবিরের নাম, দবিরের ভাই মোনায়েমের নাম বলে দেয়, তাই সেনারা দবিরকে ও মোনায়েম মনাকে আটক করে। ৩ দিন পর মোনায়েমকে অনেক টর্চার করে ছেড়ে দেয়। দবিরকে ছাড়েনি। সেনাক্যাম্পে ৩৬ দিন আমাকে অনেক টর্চার করে,আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল আমি ৩ টি স্কুলে মেট্রিক পরীক্ষা বন্ধ করার জন্য গ্রেনেড মেরেছি। আসলে আমি কোনই স্কুলেই কোন অপারেশন করি নাই। আর্মিরা আমার কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে চায়, কিন্তু আমি মুখ খুলিনি। তারা আমার কাছ থেকে কোন ইনফরমেশনও পায় নি।আমি বলেছি আমার বন্ধু পার্সোনাল আক্রোশে আমার নাম বলেছে, সে আমার বই চুরি করেছিল, আমি প্রিন্সিপালের কাছে নালিশ দেয়ায় সে শত্রুতা করে আমার নাম বলেছে। পরে আর্মিরা প্রমাণ আছে কিনা জানতে চাইলে, আমি প্রিন্সিপাল ফাতমী স্যারের নাম বলি। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের লোক, আমি জানতাম ফাতমী স্যার দেশে নাই। আর্মিরা উনাকে খোঁজ করতে কলেজে যায় এসে আমার উপর টর্চার কিছুটা কমিয়ে দেয়। আমাকে ৩ স্কুলের দারোয়ান দিয়েটি আই প্যারেড করায়।ফায়ার সার্ভিসের একজন প্লেয়ার ছিলেন আলতাফ ভাই।এ এলাকার আর্মির কমান্ডিং অফিসার কর্র্ণেল খোরশেদ এর সাথে তার সম্পর্ক ছিল, তারা দুজন ফুটবল খেলোয়ার ছিলেন। তিনি তার সাথে যোগাযোগ করে আমাদের মামলা গুলো পুলিশের কাছে দিয়ে দেয়। আলতাফ ভাই সিও খোরশেদের কাছে বলেন, নজরুল ভাল ছেলে। এছাড়া আমাদের কাছে কোন অস্ত্র পায় নাই ও কোন প্রমাণ পায় নাই। তখন তারা আমার মামলা পুলিশের কাছে দেয় এবং আমাকে পুলিশে সোপর্দ করে। আমার বিরুদ্ধে ৩ টি মামলার আইও ছিলো ডিএসপি সামাদ তালুকদার। এ সময়ে রাজশাহীতে ডিএসপি সামাদ তালুকদারের বাবাকে মুক্তি বাহিনী মেরে ফেলে,এই খবর পেয়ে আমিও ভয় পেয়ে যাই,এই ভেবে সামাদ তালুকদার আমাকে মেরে ফেলবে।কিন্তু উল্টা সামাদ তালুকদার বাঙ্গালী এরশাদ নামক কনস্টেবলের মাধ্যমে গোপনে তিনবেলা ওষুধ এনে আমাকে খাওয়াতেন এবং চুপচাপ বলতেন ,মুখ খুলবি না। পুলিশ আমাকে সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেয় সেখান থেকে ২৪দিন পর আমার জামিন হয়।আমি জামিনে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে যাই,মার সাথে আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখাকরি। বাড়িতে মাত্র ২ ঘন্টা সময় কাটিয়ে আমার ক্যাম্পে চলে যাই। আবার অপারেশন পরিচালনা শুরু করি। এসময়ে একবার ইন্ডিয়া যাই। সেখানে খালেদ মোশাররফ সাহেব বাদল ভাইয়ের মাধ্যমে খবর দিয়ে আমাকে ডেকে নেন। সাথে ছিলেন এটি এম হায়দার সাহেব। উনারা তখন নির্দেশ দেন হামিদুল হক চৌধুরী প্রেস আমাদের বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার ছাপাচ্ছে, এটাকে গুড়িয়ে দিতে হবে। তোমার কয়দিন সময় লাগবে। আমি বল্লাম , ঢাকা যাওয়ার পর দুই দিন সময় লাগবে। কিন্তু আমাকে এক্সপ্লোসিভ এবং আনুসাঙ্গিক যা আছে তা বেশী বেশী দিতে হবে। তখন তারা বল্লেন, তোমার যা লাগে নিয়ে যাও।

হামিদুল হক চৌধুরী ভাঙ্গা প্রেসে আমরা তিনবার অপারেশন করেছি, দুবার শব্দ করার জন্য। ওটা বন্ধ রাখার জন্য বাইরে থেকে গ্রেনেড মারতাম। এই প্রেসের মালিক ছিলেন হামিদুল হক চৌধুরী, সে সময় পররাস্ট্র মন্ত্রী ছিলেন এবং এই প্রেস থেকে অবজারভার পত্রিকা প্রকাশ হতো । তারা মুসলিমলীগের নেতা ছিলেন। প্রেসটি তৃতীয়বার নির্দেশ পেয়ে আক্রমণ করি এবং পুরা প্রেসধ্বংস ও গুড়িয়ে বন্ধ করে দেই। ধ্বংস করায় এ এলাকার নাম ভাঙ্গা প্রেস হয়ে যায়। আমার নেতৃত্বে এই হামিদুল হক প্রেস অপারেশনে যারা ছিলো তারা হচ্ছে আব্দুল মতিন, মোঃ সিরাজ, আশরাফ, মোঃ সামসুদ্দিন,মোঃ মোজাফফর,মোঃ ইব্রাহিম,মোঃ নবু, বাবুল, সামু, সামসু, নুর ইসলাম, মানিক, জয়ধর আলী, হিন্দু রতন, মোঃ দবির, মোঃ এনামুল, মোঃ সালাউদ্দিন, মোঃ মোবারক, মোঃ হারুন, মোঃ সোলয়মান, মধু মেম্বার, মোঃ শাহজাহান,ইঞ্জিনিয়ার বাশার, রূপগঞ্জের আহসান উল্লাহ, আব্দুস সালাম।আমরা প্রথমে খোঁজ নিলাম প্রেসে কারা কাজ করে।ওখানে কাজ করে এমন দুজন পেলাম ,তাদের নাম শামসুদ্দিন ও মোজাফফর। তারা কোথায় কি আছে, কয়জন লোক আছে ,কয়টি অস্ত্র আছে এগুলো জানায়। তারা আরও জানালো দিনের বেলায় পাঞ্জাবীরা টহল দেয় এবং লোক থাকে। কিন্তু রাত্রে মাত্র ২৫ জন থাকে এবং তাদের অস্ত্র হলো বল্লম টেটালাঠি। কোন আগ্নেয়াস্ত্র তাদেও কাছে থাকেনা।তাই আমরা খুব সহজ মনে করলাম এবং রাতে ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা অপারেশনে গেলাম।সেদিন বাহিরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল, আমরা মেইন রোড দিয়ে না গিয়ে, রোডের নীচ দিয়ে গেলাম। আমাদের কাছে বিভিন্ন অস্ত্র ছিল। অনেক এক্সপ্লোসিভও নিয়ে যাই। আমরা প্রথমে যে সব দারোয়ানরা পাহারা দিচ্ছিল তাদের সারেন্ডার করালাম, আর কয়েকজন যারা ঘুমিয়েছিল ওদের উঠানো হলো, আর চতুর্দিকে যারা ছিল তাদেরকে ডেকে আনল। আমি বললাম তোমরা মরতে চাও, না বাঁচতে চাও? তারা বলল, দেখেন আমাদের পাঁচ মাস যাবত বেতন দেয় না, খোঁড়াকের অল্প টাকা দেয়। আমরা বড় কস্টে আছি, আমাদের মাইরেন না, আমরা চলে যাব। তখন তাদের আমরা এক জায়গায় লাইন করে বসিয়ে রাখলাম। ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা তাদের পাহাড়ায় ছিল। আমি সহ মতিন, সিরাজ, দবির, শামসুদ্দিন, মোজাফফর প্রেসে ঢুকি। গিয়ে দেখি কোন কোন মেশিন গুলো বেশী দামি। সেখানে অনেক বড় একটা ক্যামেরা ছিল, প্রত্যেকটা মেশিনের আমরা এক্সপ্লোসিভ লাগালাম। বিল্ডিং এর আটটি পিলারে এক্সপ্লোসিভ লাগালাম এবং চিকন ইলেকট্রিক তার যুক্ত করে আমরা নিজেরা ফ্যাক্টরীর বাইরে নিরাপদ জায়গায় গেলাম । সেখানে সাইকেলের পাম্পারের মতো এক্সপ্লেসিভ বিষ্ফোরণ ঘটানোর যন্ত্র দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটালাম। বিকট শব্দে ফ্যাক্টরী গুড়িয়ে গেল। সেদিন আমার গায়ে জ্বর তবু বৃস্টিতে ভিজেছি । ব্রাস্ট করার জন্য পাম্পারে কে চাপদিবে ? বলতেই , সবাই বল্ল , তুমি নেতা, তুমিই চাপ দাও। আমি চাপ দিলাম, চাপ দেওয়ার সাথে সাথে বিষ্ফোরণ সফল হলো। অপারেশন শেষ করে আমরা সবাই ফিরে এলাম, ফ্যাক্টরীর গরীব দারোয়ানদের কিছু টাকা গাড়ি ভাড়া বাবদ দিয়ে বিদেয় করে দিলাম। পরদিন সকালে খবর পেলাম মোজাফফরের লাশ ফ্যাক্টরীর কাছে পাওয়া গেছে। এই অপারেশনে মোজাফফর রাতে ই শহীদ হয়।
পোস্তগোলা থেকে একটু সামনে শ্যামপুরের দিকে,বর্তমানে যেখানে চীন মৈত্রী সেতু/বুড়িগঙ্গা ব্রিজ তার বাম দিকে ঈগল বক্স এন্ড কার্টুন ম্যানুফ্যাকচারার কোম্পানী ছিল। যেটার মালিক ছিল পাকিস্তানীরা। এটা ছিল তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি। ঈগল বক্স ফ্যাক্টরি থেকে সরকারি অনেক কিছু ছাপানো হত। রাতের বেলার্আমিরা তাদের ক্যাম্প ছাড়া অন্য কোথাও থাকত না। ভয় পেত। তাই রাতে আমরা ঈগল বক্স ফ্যাকটরীতে অপারেশন চালাই এবং গান পাউডার ও পেট্রোল দিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলি। স্বাধীনতার পর এটা জাতীয়করণ করা হয় এবং পরবর্তীকালে এটা বেসরকারি মালিকানায় বিক্রি করে দেওয়া হয়।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এর দিকে আমরা আমি ম্যাচ ফ্যাক্টরীতে অপারেশন চালাই। সেখানে গিয়ে দারোয়ানদের বেঁধে ফেলি। ওখানে কাজ কওে এমন দু-একজন কেসাথে নিয়ে ফ্যাক্টরীতে ঢুকি। ম্যাচ ফ্যাক্টরীতে ছিল অনেক বারুদের ড্রাম এবং কাঠের ছোট ছোট টুকরা। আমাদের সাথে যাদের নিয়েছিলাম তাদের একজন বল্ল, এই মেশিনটার দাম বেশী। এটা অনেক কাজের। আমরা সেটিতে এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে দেই। এছাড়া প্রতিটা মেশিন নিচে আমরা এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে দিয়েছিলাম। একটা মেশিন থেকে অন্যটির যুক্ত করে প্রাইমাকড লাগিয়ে দিলাম। একটা মেশিনে যে সময়ে ব্লাস্ট হবে, সেই একই সময় আরেকটা মেশিনটাও ব্লাস্ট হবে। প্রাইমাকডের এতো গুণ। একটা সেফটি ফিউজ থাকবে। তারপর সেফটি ফিউজ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলাম এবং মেশিনগুলো কলাপ্স করে দিলাম। আমিন ম্যাচ ফ্যাক্টরি মেশিন গুলো ঠিক একই ভাবে কলাপ্স করে ধ্বংস করে দিলাম। এই অপারেশনে আমাদের সহযোগী ছিল মতিন,সিরাজ, দবির,বাবুল (বাবুল পরবর্তীতে জার্মানিতে চলে যায় এবং সেখানে মারা যায়) নবু ,সালাম, হিন্দু রতন, আশরাফ, জিন্নাহ, হানিফ। হানিফ আমাদের খুব ভালোও সাহসী যোদ্ধা ছিল। ও একা একটা অপারেশন করেছিল। বর্তমানে যেখানে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল তার পূর্ব দিক দিয়ে গর্ত ছিল,ওখানে ঢাকা শহরের সব আবর্জনা ফেলা হতো। এর আশে পাশে কিছু সমতল ভূমি ছিল, যেখানে ঘাস হতো এবং মানুষ এগুলো কেটে নিয়ে গরুকে খাওয়াতো। এখানে এক মহিলা খারাপ কাজের উদ্দেশ্যে দুইটা ঘর তুলল। এখানে অনেক মহিলা ছিল এবং আর্মি অফিসাররা এখানে আসতো। একদিন দুপুর বেলা এয়ার ফোর্সের দুজন অফিসার মাতাল অবস্থায় ওখানে গিয়ে ফুর্তি করছিল, একজন বয়স্ক লোক (বশীরের বাবা) এগুলো দেখে ঘাস না কেটে চলে আসে। এমন সময় হানিফের সাথে দেখা। হানিফ আমার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে একটি স্টেনগান সহ তার মার সাথে দেখা করতে এসেছিল।আসার পথে ঐ মুরুব্বী বললেন, হানিফরে দেখ ,শালারা মদ খেয়ে ওখানে কি করছে।” হানিফ খুব জেদি ছিল। সে বস্তা কাঁধে নিয়ে,মাথায় গামছা পেঁচিয়ে রাখাল সাজে এবং ঐ ঘরের কাছাকাছি যায়। একপর্যায়ে স্টেনগান দিয়ে একা ঐ দুই অফিসারকে হত্যা করে। ওদের পোশাক খুলে এবং ওদের কাছে থাকা দুটি পিস্তল নিয়ে এসে আমার কাছে জমা দেয়। আমাদের সাথে ট্রেনিংপ্রাপ্ত সবাই এই ঘটনাজানে। গাজীভাই, ফতেহভাই, আবু সাঈদ ভাই, মায়া ভাই, সিরাজভাই, মোজাম্মেল ,আনোয়ার,গিয়াস আব্বাস ওরা সবাইজানে। আমি হানিফকে তখন ভারতে পাঠিয়ে দেই। এবং পিস্তল দুটি এটিএম হায়দার ভাইকে গিফট হিসেবে দেয়ার কথা বলি। এবং সে যায় এবং ক্যাম্পর সবার সামনে পিস্তল দুটি হস্তান্তর করে তখন ক্যাম্পর সবাই হানিফকে নিয়ে বিজয় উল্লাস করে।
আমাদের আরও একটা অপারেশন ছিল গেন্ডারিয়া রেল স্টেশনে,ওখানে আমি এজ এ কমান্ডার, কভারিং পার্টি তে ছিলাম। আমরাই রেকি করি এই অপারেশনের। আমাদের ছেলেদের দুটি গ্রুপ এতে অংশ নেয়। তারা অতর্কিত হামলা করে কয়েকজন পাক আর্মি কে গুলি করে আহত করে। আর কয়েকজন অস্ত্র ফেলে পালিয়েযায়। অপারেশন চলাকালে একটি ট্রেন চলে আসে। আমার সহযোদ্ধা আশরাফ রেগে গিয়ে গুলি করে বলে, আমরা যুদ্ধ করে মরছি, আর তোরা ট্রেন চালাচ্ছিস ? গুলিতে ট্রেনের ড্রাইভার ও সহকারী ড্রাইভার আহত হয়। ট্রেনটি গোপীবাগ রেল গেটে এসে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে যায়। পরে জানতে পারি ড্রাইভার মারা যায়নি। তার বাড়ি ছিল মাতুয়াইল। মাতুয়াইলের ড্রাইভারের বাড়িতে আমার বাবা-মাবোনেরা কিছুদিনের জন্য যুদ্ধের সময় আশ্রয় নিয়েছিল। সে আসলে পেটের দায়ে চাকরি করতো আর স্টেশন মাস্টারকে নন বাঙালি মনে করে আমাদের ছেলেরা ধরে নিয়ে আসে,আসলে সে নন বাঙালি ছিলনা, সে ছিল কলকাতা থেকে মাইগ্রেন্ট বাঙ্গালী। তারপর তার তিন মেয়ে যখন এসে পরিচয় দিলো, তখন দেখা গেল তার বড় ছেলে আমাদের সাথে পড়তো। মেয়েরা আরও বল্লো আমরা তিন বোন এক ভাই, আমরা বাঙ্গালী , আমাদের এক বোনই ইউনিভাসিটিতে পড়ে আর দু বোন কলেজে পড়ে। আমাদের বাবাকে মেরে ফেল্লে, আমরা কিভাবে বাঁচবো? এসব শুনে আমরা তাকে ছেড়ে দেই। তারপর মেয়েরা বলে,আমাদেও রাস্তাটা পার করে দেন, তা না হলে,অন্যরা আমাদেও ধরতে পারে। আমার সাথে ছিল নাজিমউদ্দিন মাস্টারও ফারুক। (পরবর্তীতে ফারুক যুদ্ধে শহীদ হন, তার নামেই এখন যাত্রাবাড়ি রোড এর নামকরণ করা হয়েছে শহীদ ফারুক সড়ক)ফারুক আমার ভাতিজা। মেয়ে গুলোকে এবং তাদেও বাবাকে পার কওে দিতে গিয়ে আমরা র্আমির ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে গেলাম। পুরো স্টেশন রেললাইন সব জায়গা আর্মি ঘেরাও করে রেখেছিল,আমরা গিয়ে চতুর্দিকে উঁচুও বস্টিভিটায় একটা পুকুরে আশ্রয় নিলাম। কারন আমাদের কাছে যে অস্ত্র আছে তা দিয়ে তাদের মোকাবেলা করতে পারবো না। উল্টো মারা পরবো। আমাদের থিউরি ছিল হিট এন্ড রান। আর্মিদের গুলাগুলিতে একজন কুলি ও স্কুলের দপ্তরি দুই নাতি মারা যায় । তখন ছিল রোজার মাস,আমাদের তিনজনের মধ্যে ফারুক গেন্ডারিয়াতে অপারেশনে শহীদ হয় এবং নাজিমুদ্দিন মাস্টারও পরে মারা যায়।
সায়েদাবাদ ব্রিজে আমরা প্রায়ই অ্যামবুশ করতাম। এম্বুসের সময় সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য দিতাম আবদুল ওয়াদুদ অদুনকে । তার গায়ে অনেক শক্তি ছিল। সে খুব অল্পসময়ে সড়কের ঢালে ব্যাংকার তৈরী করতে পারতো। এই সব ব্যাংকাওে বসে আমরা এস এলআর, থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে উৎপেতে থাকতাম। আর এন্টি ট্যাংক মাইন রাস্তায় পুতে রাখতাম। যেই পাকিস্তানী আর্মিও কনভয় আসতো প্রথমটাই চিটপটাং হতো মাইনের আঘাতে। তখন আমরা যারা নীচে পারতো তাদেও পিছনের অন্য গাড়ির আলোতে দেখতে পেয়ে গুলি করতাম। তারপরই আমরা স্থান ত্যাগ করতাম। শেষের দিকে যাত্রাবাড়ির ওপর পাকবাহিনীর দারুন নাখোশ হয়েছিল,যাত্রাবাড়ির মানুষ দিনের বেলা পেলে ধওে নিয়ে যেত এবং মেরে ফেলতো। তাই আমরা যাত্রাবাড়ি চেঞ্জ করলাম। চলে গেলাম কমলাপুর,সেখানে আমরা অনেকগুলো অপারেশন করি,এরমধ্যে কমলাপুর পানির পাম্পে অপারেশন করি। আমার এক বন্ধুছিলভুলু। এর সাথে পাম্পের দারোয়ানের খাতির ছিল। ওর সহযোগিতায় এই অপারেশন করি। পাম্পের দারোয়ান গাঁজা খেত। গাঁজার লোভ দেখিয়ে ওকে একটু দুরে নিয়ে বসাই, আমরা এই ফাঁকে এক্সপ্লোসিভ টাইম পেন্সিল দিয়ে চলে আসি। আমরা বাইরে আসার পরপরই এটা ধ্বংস হয়ে যায়। র্আমিরা তখন তেলের ট্যাংক নিয়ে কমলাপুর থেকে নানা জেলায় যেত, আমরা একদিন তেলের টাংকারে অপারেশন করে এবং জ্বালিয়ে দেই। ঈগল বক্স ফ্যাক্টরি আমিন ম্যাচ ফ্যাক্টরি পো¯তগোলা ইলেকট্রনিক সাপ্লাই, দুবার অপারেশন করে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি, বাসাবো পুলিশ ফাঁড়িতে দুবার অপারেশন হয়েছে। একবার আমরা ছিলাম, একবার আমরা ছিলাম না। জায়গায় জায়গায় আমরা অ্যামবুশ করতাম। মাতুয়াইল, ডেমরা রোড,যাত্রাবাড়ি পুলিশক্যাম্প, গোলাপবাগ স্লোটার হাউস আর্মি ক্যাম্প। এখানে আর্মিকে প্রায়ই এ্যাটাক করতাম,আমরা হিট করেই পালিয়ে যেতাম। ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেনে আমাদেও ৭ জনের গ্রুপ ছিল। হায়দার সাহেব এবং খালেদ মোশাররফ সাহেবের খুব আস্থা ছিল আমাদের উপর। আমাদের যতগুলো টার্গেট দেওয়া হয়েছিল আমরা কোনটাই মিস করি নাই। আমার নেতৃত্বে আরেকটা অপারেশন ছিল কমান্ডার চুলা ফ্যাক্টরি অপারেশন। এটাও উড়িয়ে দিয়েছিলাম। এটাছিল ভাঙ্গা প্রেসের উল্টো দিকে,এই অপারেশনে আমার টু-আইসি ছিল ইঞ্জিনিয়ার আবুল বাশার সে ছিল রাজশাহীর ছেলে, হানিফ জিন্নাহ, পুলু, ভুলু, দবির, সিরাজ, আশরাফ, মতিন, বাবুল, নবু ,সালাম, আতাউর রহমান ফালু, সোলায়মান, শামসুদ্দিন, সামিউল্লাহ সামু।
আমাদের যাত্রাবাড়ি এলাকার লোকদেও মধ্যে আব্বাসউদ্দীন আহমেদ, শামসুদ্দিন কন্ট্রাকটার, হাজীচাঁদ মিয়া আমাদের খুব সাহায্য করতেন। আর.কে.চৌধুরী তিনিও সাহায্য করতেন। পরে তিনিও মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, আমার সাথে তার দেখা হয়েছিল আগরতলায়। আব্বাস সাহেবের বাড়িতে আমাদের ক্যাম্প ছিল। তিনি ছিলেন পিস কমিটির কনভেনার, যদিও তিনি ছিলেন পিস কমিটির কনভেনার, কিন্তু আমাদের কাজই করতেন। আমি বললাম,আপনি পিস কমিটিতে গেলেন কেন? উনি বললেন,তানা হলে তোমাদের সেভ করা যাবে না। আমাদেও এখানকার রাজাকাররা আমাদের কোনো ক্ষতি করে নাই। আমাদেও সাহায্য করেছে,আব্বাস সাহেব তো আমার জন্য এরেস্ট হয়েছেনএবং পাকিস্তানী সেনাদেও হাতে নির্যাতিত হন, উনি আমার বা আমাদের কারোর নাম বলেন নাই। আমাদের কোনো ক্ষতি করেনাই। তাঁর অবদান আমরা সারাজীবন মনে রাখবো, আমাদেও সাহায্য করার কারণে তার সরকারী ব্যবসা, রেশন দোকান পারমিট এসব বাতিল করে দিয়েছিল। তার স্ত্রীও বোরকা পরে আমাদের খবরা-খবর নিতেন-আনতেন,আমি একবার ঘেরাও এর মধ্যে পড়ে গেলাম। পালানোর কোনরাস্তা নেই, তিনি কোথা থেকে যেন একটা বোরকা নিয়ে এলেন,আমরা দুজনে বোখরা পরে নারিন্দার চলে গেলাম,এমনি ভাবে দিনের বেলাতে আমাদের পালিয়ে থাকতে হয়েছে,আর রাতের বেলা হলে আমরা অপারেশন করতে বের হতাম।
খালেদ মোশাররফ সাহেবের নেতৃত্বে এটিএম হায়দার সাহেব সহ আমরা ১২ জন বেলুনিয়াতে যাই। সম্মুখ যুদ্ধ করার জন্য বেলুনিয়াতে আমাদের দশ জনকে বাছাই করা হয়। ১০ জনেরমধ্যে আমি, মায়া (মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীমায়াবর্তমানেমন্ত্রী), গাজী গোলাম দস্তগীর (বর্তমানে মন্ত্রী), আবুল, জিন্নাহ, আবুসাঈদ খান, ফতেহআলী, আলম ভাই, রূপগঞ্জের আব্বাস, হানিফ ছিলেন। আমরা যখন বেলুনিয়াতে গেলাম তখন নদীপাড় হতেই দেখি যুদ্ধ থেমে গেছে, এবং পাকিস্তানীরা পিছু হটেছে। সেখানকার সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন বীর যোদ্ধা ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম। বেলুনিয়ার মুক্ত স্থানে মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ছিলো। টার্গেট ছিল বিশ্ববাসীকে দেখানো যে বাংলাদেশে এই অংশটুকু স্বাধীন।
আমরা সবচেয়ে বেশি পাক আর্মি খতম করেছিলাম স্লটার হাউজে ও সায়েদাবাদ ব্রীজের এম্বুসে, গোলাপবাগে সিটি কর্পোরেশনের কসাইখানা তৈরী করেছিল,এখানে বিরাট আর্মি ক্যাম্প বসে, এখানে সবচেয়ে বেশি আর্মি খতম করি। বর্তমানে যেটা যাত্রাবাড়ি থানা সেটা ছিল পাঞ্জাবীদের কারখানা। এ কারখানাতে আর্মি ক্যাম্প করেছিল। সামাদ সুপারমার্কেট,রহমান ম্যানশন একটা আর্মি ক্যাম্প ছিলো। আমার বাড়ি ২৭২ যাত্রাবাড়িতে আর্মিরা সব লুট কওে নিয়ে আর্মি বসিয়েছিল, আমাদেও বাড়ির পাশে মসজিদের মিনারের উপর মেশিনগান বসানো ছিল। পাইলট চুলা ফ্যাক্টরীতে আর্মি ক্যাম্প ছিল। এত ঘনঘন আর্মি ক্যাম্প থাকার কারণ ছিল, যাতে মুক্তিযোদ্ধারা এপার ওপাড় যেতে না পারে। আব্বাসউদ্দিন সাহেবের বাসা ছিল আমাদের অন্যতম ঘাঁটি। মাতুয়াইলের হাবিবুর রহমান মোল্লা সাহেব আমাদের সংগঠক ছিলেন। ওখানে তিনি আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন। আমার সাথে অনেক জায়গায় গিয়েছেন।
উনি তখন কন্ট্রাক্টরি করতেন, আমি মনে করি পানি ছাড়া যেমন মাছ বাঁচতে পারেনা তেমনি মুক্তিযোদ্ধারাও জনগণেরসাহায্য ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ করতেপারতনাবা দেশ স্বাধীন হতে পারতনা। এদেশের মানুষ বেশির ভাগই আমাদের পক্ষে ছিল। অনেকে নিজেরা প্রাণ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সেভ করেছেন। আমি মনে করি এ দেশের যুদ্ধ করতে পেরেছি শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের সহযোগিতার কারণেই। সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ সফল হতোনা।
জীবনবাজি রেখেমহান মুক্তিযুদ্ধ করেছি। নানা বিপদ ছিল যুদ্ধকালীন সময়ে মহান সৃস্টিকর্তা সহায় ছিলেন সবসময়। রণাঙ্গন থেকে ফিরবো এমন ভাবনা-ই ছিলনা। টার্গেট দেশকে মুক্ত করবো। পাকিস্তানীরা যে বর্বর আচরণ, নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে সেটাি নজের চোখে দেখেছি। এই বর্বতার প্রতিবাদে মন সবসময় প্রতিবাদী ছিল।
যুদ্ধের শেষের দিকে নভেম্বর মাসের ঘটনা। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকার দয়াগঞ্জ থেকে ২ জন রাজাকারকে ধরে যাত্রা বাড়ি নিয়ে আসে। আমরা তাদের আমাদের ক্যাম্প পাটেরবাগে পাঠালাম। সোলায়মান, আশরাফ, আতাউর রহমান ফালু এবং মোবারক তাদেরকে হাত বেঁধে নিয়ে যায়। ঢাকা নারায়ণগঞ্জ রোড দোলাইরপাড় ব্রীজ পাড় হতেই ওরা দেখে দুইজন রাজাকার রাস্তার ঢালে রাইফেল নিয়ে বসে আছে। ওরা আক্রমণ করতে পারে এই ভেবে সোলায়মান এবং আশরাফ ঐ দুই রাজাকারকে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলে। তখন এলাকার লোকজন দুই রাজাকারের লাশ টেনে হিচড়ে দনিয়ার দিকে নিয়ে যায়। দোলাইপাড় ব্রীজের অদূরে পাইলট চুলা ফ্যাক্টরীতে ছিল পাকিস্তানী আর্মিদের ক্যাম্প। ঘটনার খবর আর্মি ক্যাম্পে পৌছে এবং তখন ঐ ক্যাম্প থেকে এবং যাত্রাবাড়ি ক্যাম্প থেকে আর্মিরা ঘটনাস্থলে এসে রক্তের দাগ দেখে ক্ষেপে যায়। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের খুজতে থাকে। না পেয়ে রাস্তার দুপাশের বাড়ি ঘরে গান পাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে সময় যাত্রাবাড়ির আর্মিদের সাহায্যকারী হিরণ খন্দকারকে দিয়ে ঘটনাস্থলের আশপাশ সহ পুরো এলাকায় মাইকিং করে। মাইকে বলা হয়। “ দুস্কৃতিকারী নজরুলকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিলে ৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। ” মুক্তিযোদ্ধা সহ সবাই এ মাইকিং শুনে, আমি নিজেও শুনেছি। পরের দিন হিরণকে মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম দেখতে পায় এবং তাকে সিগারেট খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে কাছে এনে ধরে ফেলে । পরে তাকে গলা চিপে ধরে যে স্থানে আগের দুই রাজাকারকে মারা হয়েছিল সেখানে নিয়ে যায় এবং মেরে ফেলে। মজার ব্যাপার হলো আমি এলাকায়ই ছিলাম অথচ মাইকিং শুনে কেউ আমাকে ধরিয়ে দেয় নি, উল্টো আমাকে উৎসাহ দিয়েছে। বলেছে,“তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও। আমাদের যা হয় হবে।” তখন মানুষের মাঝে মুক্তির একটা ব্যাপক চাহিদা ছিল।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোকে খুব মনে করি। মনে করি আমার সহযোদ্ধা যাঁরা শহীদ হয়েছেন বিশেষ করে আমার গ্রুপের শহীদ মোজাফ্ফর , শহীদ ফারুক, শহীদ আলমাস ভাই, কাজলার শহীদ আকবর ভাই , আমার খালাতো ভাই শহীদ তাজুল ইসলাম, শহীদ দোলাই চাচার কথা। তাদের কথা মনে হলে চোখ ভিজে যায়,বুকটা খা-খা করে। দেশের জন্য প্রাণ দেয়া ,সেটা কোন সাধারণ কথা নয়, কত সাহস নিয়ে দেশপ্রেম নিয়ে আমরা যুদ্ধ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন স্বার্থবাদিতা ছিল না। যাঁরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস কোন স্বার্থ তাঁদের ছিলনা। শুধু স্বপ্ন ছিল একটি স্বাধীন দেশ , একটি উন্নত দেশ , যে দেশে মানুষ সুখে শান্তিতে বাস করবে। আগামীর সন্তানরা বেড়ে উঠার সকল অধিকার পাবে। মর্যাদা নিয়ে তারা বলতে পারবে আমাদের পূর্ব পুরুষরা বীর মুক্তিযোদ্ধা । আমাদের নানা ত্যাগ তিতিক্ষায় যে দেশ দিয়ে গেছেন সে দেশের আমরা গর্বিত সন্তান। তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে সারাবিশ্বে বাংলাদেশকে মর্যাদায় পরিচয় ঘটাবে। এতো গেল স্বপ্নের কথা কিন্তু সেই স্বপ্ন সব কি এ জাতিপূরণ করতে পেরেছে এ প্রশ্ন এখন মনে বারবার উকি দেয়। যুদ্ধ শেষ করে আমরা যখন দেশে আসি , তখন থেকেই একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশে লুটতরাজ করেছে। পরের সম্পদ দখল সহ হত্যা নির্যাতন করেছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ার বদলে স্বার্থবাদীরা তাদের স্বার্থ আদায়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিল এ কথা চরম সত্য। যুদ্ধের পর পর আমাদের এলাকায় নানা কিছু ঘটেছে আমরা যতটুকু পেরেছি সে সব বিষয়ে সোচ্চার ভুমিকা রাখি। যুদ্ধের পর রাতারাতি অনেকের দিন বদলে যায় অথচ অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা নানাভাবে বঞ্চিত হতে থাকে । বিশেষ করে ৭৫ পরবর্তী সময়ে একটি মহল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেই বিকৃত করেছে। এই বিকৃতির কারণে অনেক ইতিহাস পাল্টে গেছে, অমুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীরা ও এদেশে বড় বড় আসন দখল করেছে। এদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরর রহমান জীবনের সর্বস্ব দিয়ে এ জাতির মঙ্গল মুক্তির জন্য অবদান রেখে গেছেন। কিন্তু ১৫ আগস্টের কলংকজনক অধ্যায় আমাদের স্বপ্নধারার গতিকে রুদ্ধ করেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিভক্তিতে অন্যরা সুবিধা ভোগ করেছে করছে। অবশেষ জাতির জনকের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং মুক্তিচেতনার বিকাশ প্রকৃত ইতিহাস উন্মোচনে নানা পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এ সরকারের একটি সফলতা। বর্তমান সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নানা মর্যাদা দিচ্ছেন, সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে অনেকে, এইসব কাজকে স্বাগত জানাই। কিন্তু হতাশার বিষয় এই যে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কেউ কেউ এই সব সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সুবিধাবাদীরা এখনও তৎপর রয়েছে। নানা কারসাজীতে অনেকেই স্বার্থ আদায়ে তৎপর। আমরা জীবন পণ লড়াই করে যুদ্ধ করেছি । দেশ স্বাধীন করেছি। আমাদের জীবনের কোন চাওয়া পাওয়া নেই, শুধ ু মর্যাদার বিষয়টি যেন নিশ্চিত হয়। কোন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যেন তার সম্মান এবং অধিকার ও সম্মান থেকে বঞ্চিত না হয় সে ব্যাপারে সরকার সহ আগামী প্রজন্ম সচেতন ভূমিকা রাখবেন এটাই কামনা। ………………. সংগ্রহ : আল আমীন শাহীন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

May 2024
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
আরও পড়ুন
অনুবাদ করুন »