ঢাকা      শনিবার ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জল পানির দিঘী : অভেদ সম্প্রীতির সুখবন্ধন -আল আমীন শাহীন

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ৬:০৬ অপরাহ্ণ , ২৫ অক্টোবর ২০২১, সোমবার , পোষ্ট করা হয়েছে 5 years আগে

লাল সবুজ বাংলাদেশের ছোট্ট গ্রাম কৃষ্ণপুর। এ গ্রামের মানুষগুলো মিলেমিশে থাকে। প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ, সবুজ সোনালী ফসলের মাঠের উপরে নীল আকাশ। স্থানে স্থানে বয়সী বট,উঁচু তালগাছ সহ নানা রকম সবুজ ছায়ার গাছ, পুরো গ্রাম জুড়ে। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট নদী, পুকুর ডোবা দিঘী সবই আছে। পুরনো জমিদার বাড়ির বড় দিঘীটিতে আজও রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ঘাট।এ দিঘীতে লাল পদ্ম নিতে আসেন আজও নাথ বাড়ির মালতি পিসী। গোসল করে গ্রামের বৌ ঝিরা। ভরদুপুর হলেই গাঁয়ের কিশোর কিশোরীরা পানির ঝাপটায় ঢেউ তুলে, মেয়ে ছেলেরা এক সাথেই ডুব সাঁতারে প্রতিযোগিতায় এ পাড় ওপাড়ে লাল করে চোখ। কে কি করছে সেদিকে কারো নজর নেই জল পানির দিঘীতে। দিঘীর একপাড়ে মসজিদ অন্যপাড়ে মন্দির অনেক বছরের পুরনো। এতেই এর নামকরণ জলপানির দিঘী।

কৃষ্ণপুরের ছেলে রহিম আর গোপাল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শৈশব কৈশোর এক সাথেই। একই স্কুলে লেখাপড়া, একই মাঠে খেলাধূলা। বিকেল হলেই দিঘীর ঘটলায় দুজনে বসে আড্ডা জমায় ঘনিষ্ঠভাবে। গাঁয়ের নিরঞ্জন, শেখর, সামসু হরিপদ, রামলাল অনেকেই আসে। তবে সখ্যতাটা সবার সমান নয়। নিরঞ্জন এরমধ্যে একজন। একটু আলাদা। ধর্ম বৈষম্যে ও গোঁড়ামিতে ততটুকু মেলামেশায় সে জড়াতে পারেনা। কিছুটা দূরে দূরে থাকে। রহিম নিরঞ্জনের প্রতি দরদী হলেও সে কিছুটা অন্যভাবেই থাকতে চায়।
নিরঞ্জনের মা মালতি পিসী। সত্তর বয়স পেরিয়েছে অনেক আগেই। মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বামীকে হারিয়ে একমাত্র পুত্র নিরঞ্জনকে ঘিরেই তার জীবনের সুখ। মালতি পিসী সবারই পছন্দ। এ বাড়ি ও বাড়ি যান, সবার খোঁজ খবর রাখেন। রহিমকেও স্নেহ করেন একটু বেশী। ঘাটে আসলে মালতি পিসীকে দেখে রহিম কুশালাদী জিজ্ঞাস করে, মাঝে মধ্যে গাছ থেকে নানা রকম ফল তুলে দেয় মালতি পিসীর হাতে। সাদা শাড়ীর আঁচলে সেই ফল জমিয়ে মুখের মিষ্টি হাসিতে রহিমের শাতায় হাত বুলাতে বুলাতে মালতি পিসী বলেন, রহিম ,তুই একটা পাগলই। রহিম বলে , তুমি মাসি আমাদের বটগাছ। এসব কথায় হেসে উঠে সবাই। এদিকে কৃষ্ণপুরে এক ঘটনা ঘটলো, বেশ কয়দিন ধরে মালতি পিসী আসছে না ঘাটে, নিরঞ্জনের ও দেখা নেই। বিষয়টি আঁচ করলো রহিম, জিজ্ঞেস করলো গোপালকে। গোপাল জানাল জানি না, নিরঞ্জনকে বেশ কয়দিন দেখছিনা। শেখর বল্ল, নিরঞ্জনটা একটু দূরে দূরেই থাকে। রহিমকে ততটা মন থেকে নিতে চায় না। হয়তো কোথাও বেড়াতে গেছে। এসব কথা বার্তার পর কেটে গেছে আরও এক সপ্তাহ। দিঘীর ঘাটে দেখা নেই মালতি পিসী আর নিরঞ্জনের। এরমধ্যে সেদিন দেখা নন্দননগরের ডাক্তার তৌহিদ আহমেদের সাথে। এমবিবিএস ডাক্তার হলেও কৃষ্ণপুরের মানুষের কাছে গাঁয়ের প্রিয় ডাক্তার বলেই তিনি পরিচিত। অনেক লেখা পড়ার ডাক্তার গ্রামে এসে আঞ্চলিক ভাষায়ই কথা বলে সবার সাথে মিশে গেছেন। কয়েক মাইল হেঁটে এ গ্রামে আসতে তিনি ক্লান্ত হন না। দিঘীর পাশ দিয়ে যেতে দেখেই গোপাল এগিয়ে যায়, জিজ্ঞেস করে, ডাক্তার কাকা কেমন আছেন , উত্তর, ভালো বাবা , রহিম শেখর তোমরা সবাই একাসাথেই আছো। ভালো ভালো। এক সাথেই থেকো। চলে যাচ্ছিলেন, রহিম জিজ্ঞ্সে করলো, কোথায় এসেছিলেন ডাক্তার চাচা, উত্তরে বল্লেন , নিরঞ্জনদের বাড়ি, ওর শরীর টা ভালো না। দিন দিন অবনতিই হচ্ছে। অল্প বয়সী ছেলে অথচ রোগটা জটিল, বেশ কয়দিন শহরের হাসপাতালে ছিল, কিডনি রোগ। চিকিৎসার খরচ যা তা নেই তার পরিবারের কাছে, এখন বাড়িতেই চলে এসেছে। ডাক্তার সাহেবের মুখে এ কথা শুনে সবাই আশ্চর্য হলো, তাইতো এ জন্যই নিরঞ্জনকে দেখা যায়না। রহিম ডাক্তার সাহেবের কাছে জানতে চাইলো, কি করলে ভালো হবে সে, বল্লো, কিডনি লাগবে। টাকাও লাগবে অনেক। একথা বলে চলে গেলেন ডাক্তার তৌহিদ। ঘাটে বসা রহিম গোপাল আর সব বন্ধুরা। রহিম বল্লো “চল গোপাল নিরঞ্জনকে দেইখ্যা আই”।
নিরঞ্জনদের বাড়ি নাথ পাড়ায় গায়ের শেষ প্রান্তে। বাড়িতে ছোট্ট একটি কুড়েঘর, উঠোনে তুলসী গাছ, মাটির চুলা এক কোণে। আগে উঠোনটি বেশ পরিস্কার বিন্যস্ত ছিল, এখন কেমন যেন এলো মেলো, অগোছালো। ঘরের বারান্দায় বসে আছেন মালতি পিসী, পাশে শুয়ে থাকা নিরঞ্জনের মাথার কাছে। মালতি পিসীর পরিষ্কার মুখটি অনেক মলিন,চোখের নীচে কালো দাগ। সবাইকে দেখেই মালতি পিসী অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন, অনেক টা বিলাপ করেই। রহিম কাছে যেতেই তাকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ বেড়ে গেল, বারবার বলছেন, ‘আমার তো সবই শেষরে বাবা, সবই শেষ, একটাই পুত, হের অহন মরণ দশা। আমি অহন কি করুম- করুম’। বারান্দায় খোলা চাটাই উপর শুয়ে আছে নিরঞ্জন। কিছুই বলছে না , শুধু অপলক চোখে তাকিয়ে আছে। চোখ থেকে মুখ গড়িয়ে জলের ধারা। পাশে গিয়ে বসলো, গোপাল রহিম শেখর হরিপদ সামসু। রহিম নিরঞ্জনের হাতটা ধরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বল্লো,“ সব বলেছে ডাক্তার চাচা, চিন্তা করিছ না , আল্লাহ আছেন, তাইনে সব ঠিক কইরা দিব, ইন্শাল্লাহ”। ফেরার সময় মালতি পিসীকে রহিমই বল্লো ,“ পিসী কাইন্দ না, চিন্তা কইরোনা, ভগবান আছেন, তাইনেই দেখবো”। মালতি পিসীর বিলাপ বেড়ে গিয়ে সারা বাড়ি ছড়িয়ে পড়লো। সেই বিলাপ রহিম গোপাল শেখরদের মনে গেঁথে গেল। আবারো জলপানির দিঘীর ঘটলায় সবাই। সিদ্ধান্ত নিল যত টাকা লাগুক তারা জোগার করবে। বন্ধুরা সবাই মিলে চেয়ারম্যান , মেম্বার গ্রামবাসীর কাছে নিরঞ্জনের আর মালতি পিসীর অসহায়ত্বেও কথা তুলে ধরতেই সবাই বিষয়টি জানল, সবাই দেখতে গেল নিরঞ্জনকে। রহিম গোপাল নিরঞ্জনকে নিয়ে জেলা সদরে, পরে ঢাকায় বড় ডাক্তারের কাছে। চিকিৎসা শেষে জানা গেল কিডনি একটিতো নস্ট অন্যটিও অচল হয়ে পড়বে। নিরঞ্জনকেকে বাঁচাতে একটি কিডনি লাগবেই। চিকিৎসা তো হলো, এখন কিডনি পাবে কোথায়?
হাসপাতালের বেডে অসহায় নিরঞ্জন। অসহায় সব বন্ধুরাও। ডাক্তার তৌহিদও দেখতে আসলেন একদিন, তারও দীর্ঘশ্বাস। তিনি জানালেন মালতি পিসীকে আত্মীয় স্বজনের মাঝে কেউ কিডনি দিলে আর তা স্থাপনের টাকা জোগার হলে , বেঁচে যাবে নিরঞ্জন। মালতি পিসী বল্লো , আমার আর কেডা আছে, কেডা ই দিব কিডনি,কই পামু টেহা পয়সা”। মালতি পিসীর বিলাপ তখন হাসপাতালের দেয়ালে প্রতিধ্বনী হচ্ছে। চলে যাচ্ছেন ডাক্তার, নিরঞ্জন বাকরুদ্ধ , দুটি পানিভরা চোখ ছাড়া আর যেন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। রহিম সব খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে, তার মনে তখন কৃষ্ণপুর গ্রাম , সেই মাঠ , সেই স্কুল , নিরঞ্জনের সাথে স্কুলে মাঠে খেলা ধূলায় কাটানো সময়, জলপানির দিঘীর আড্ডা, সুস্থ থাকা নিরঞ্জনের হাসিমাখা মুখ।
হাসপাতালের বারান্দায় ডাক্তার তৌহিদকে ডাক দিয়ে দাঁড় করালেন রহিম। কাছে গিয়ে বলো, ডাক্তার চাচা আমি কিডনি দিমু”। ডাক্তার সাহেব তখন তাকিয়ে রইলো রহিমের দিকে, পরে বল্লেন, “কিডনি দিমু তো কইলেই অইলো না। কিডনি মিলতে অইবো, মেলা ট্যাহা লাগবো ”। এগিয়ে এলো শেখর সামসু,গোপাল। টাকা জোগার আমরা করুম। পরে ডাক্তার তৌহিদ সব পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেন, রহিমের কিডনি ম্যাচ হলো। ওদিকে কৃষ্ণপুরে বাড়ি বাড়ি থেকে টাকা জোগার করলো বন্ধুরা মিলে। ঢাকায় কিডনি দিল রহিম এবং তা নিরঞ্জনের শরীরে স্থাপন হলো। এসবে অনেকদিন কাটলো। পরের ঘটনা। অনেকদিন পর আবারো আড্ডা জলপানির দিঘীর ঘটলায়। মালতি পিসী ঘাটে আসলেন তার আঁচলে অনেকগুলো মুড়ির মোয়া , পেছনে মাথা নীচু করে এগিয়ে আসছে নিরঞ্জন, ঘাটে এসে দাঁড়ালো রহিমের বরাবর। একসময় রহিমকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। মালতি পিসীর চোখেও পানি, তবে তা আনন্দের আর কৃতজ্ঞতার, মালতি পিসী বিলাপ নয়, আনন্দেই বলছে ,“ কে রহিম ? কে নিরঞ্জন? কে হিন্দু কে মুসলমান তা বুঝলাম না,শুধু দেখলাম, নিরঞ্জনের শইল্যের ভিতরে রহিম, আর রহিম নিরঞ্জন এক। একই লাল রক্ত, একই কিডনি। রহিমের জন্য নিরঞ্জনের শ্বাস প্রশ্বাস আর বাইচ্যা থাহন, জাত ধর্ম বর্ণ এইসব অহন আর বুঝিনা, সব ধর্মের সবাই মানুষ, বুঝি মানুষেরই জন্য ধর্ম , আল্লাহ ভগবান সব মানুষের জন্য, ধর্ম যার যার সৃষ্টিকর্তা সবার,একেক নামে একেকজন ডাকে, সবার ডাকেই তাইনে সাড়া দেন। কৃষ্ণপুর ভালোবাসার গ্রাম, বিপদে আপদে একে অপরে সবাই সমান,মানুষের সেবায় সকলে, মানুষের সেবায় একত্রিত মানুষ।
———————–
লেখক : সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবক

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  
আরও পড়ুন
r57 shell c99 shell pendik escort istanbul escort
অনুবাদ করুন »