ঢাকা      শনিবার ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিরহংকারী কবি আল মাহমুদ—শাহীন আল মামুন 

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ , ১৯ মে ২০২৫, সোমবার , পোষ্ট করা হয়েছে 1 year আগে

নিরহংকারী কবি আল মাহমুদ

—শাহীন আল মামুন

বাংলাদেশের মধ্য পূর্বাঞ্চলের মেঘনার কন্যা তিতাস বিধৌত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। জনশ্রুতি রয়েছে,সেন বংশের রাজত্বকালে অভিজাত ব্রাহ্মণ কূলের অভাবে এই অঞ্চলের পূজা অর্চনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হতো। সেই সময়ে রাজা লক্ষণ সেন আদিসুর কন্যাকুঞ্জ থেকে কয়েক ঘর ব্রাহ্মণ পরিবার নিয়ে আসেন এই অঞ্চলে। সেই থেকে ব্রাহ্মণদের সম্মানার্থে এই অঞ্চলের নামকরণ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এর সত্যতা কতটুকু নামকরণের সাথে যারা জড়িত ছিলেন তারাই বলতে পারবেন!
এই অঞ্চলটি শ্রীহট্ট রাজ্যের আওতায় ছিল। শ্রীহট্ট রাজ্য শাসন বিলুপ্তির পর ১৮৬০ সাল থেকে ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কুমিল্লা জেলার একটি মহকুমা ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার মৌড়াইল গ্রামে মাতা রওশন আরা মীরের কোল আলোকিত করে আসেন শিশু পুত্র। পিতা-মীর আবদুর রব খুশি হয়ে শিশু পুত্রের নাম রাখেন মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। বিয়ের পূর্বে মীর আবদুর রব ও মীর রওশন আরা বেগম সম্পর্কে চাচাতো ভাই-বোন ছিলেন।
শিশুকাল থেকেই আল মাহমুদ খুব চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন। মুরগির ছোট বাচ্চা ও বিড়ালছানা নিয়ে সারাদিন খেলা করতেন। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন মৌড়াইলের মোল্লা বাড়িতে জন্ম নেওয়া শিশু আল মাহমুদ।
কিশোর কাল থেকেই প্রকৃতিপ্রেমী হয়ে ওঠেন আল মাহমুদ। আনমনা হয়ে তিতাসের তীর দিয়ে বহুদূর হেঁটে গিয়েছেন। পলকহীন দৃষ্টি ফেলে লইস্কার বিল,মাসুরার বিল ও বারো আউলিয়া বিলের সবুজ ও সোনালী ধানের রূপ দেখেছেন। বর্ষার সময় বিলের বুকের অশান্ত ঢেউ গণনা করেছেন।
গোকর্ণ ঘাট,যাত্রাবাড়ী,ভাদুঘর,কাঞ্চনপুর ও ব্রাহ্মণবাড়ী শহরের পূর্ব পাশের জেলেপল্লী ও ভাদুঘরের ঋষি পাড়াতে নীরবে হেঁটে তাদের জীবন ব্যবস্থা উপলব্ধি করেছেন। রাখালের পেছনে হেঁটে গরুর লেজ টিপে গরুর তেজ পরীক্ষা করেছেন।
সোনালু,জারুল ও কৃষ্ণচূড়ার দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থেকেছেন। এমনকি সরষে ফুল,তিত ফুল এবং রাস্তার পাশে ফুটে থাকা অচেনা ফুল ও তিনি ভালবাসতেন।  কখনো কখনো তেলিয়াপাড়ার চা বাগানের কচি পাতা আল মাহমুদকে কাছে টেনেছে। কখনো মেঘনার চাতল পার ও লালপুরের মোহনাতে ছুটে গিয়েছেন।
ছয় বছর বয়স থেকে শিশু আল মাহমুদ শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ১৯৪২ সালে নিজ দাদি বেগম হাসিনা বানু মীরের  কাছে বর্ণমালা শিক্ষা শুরু করেন।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে শুরু করেন ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ। ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া এম,ই স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে শুরু করে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ১৯৪৮ সালে জর্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়েছেন সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত।  এর পরে দুই বছর আল মাহমুদের শিক্ষা জীবন কাটে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে। পিতা-মীর আবদুর রব একজন সংগীত অনুরাগী ছিলেন। সংগীত, তিনি ভীষণ ভালবাসতেন এবং চর্চা করতেন। তবে তিনি বেঙ্গল ফায়ার সার্ভিসে চাকরি করতেন।
বদলিজনিত কারণে কুমিল্লার দাউদকান্দি ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে তিনি চাকরি করেছেন। সেই সময়ে পরিবারের সদস্যরা ও সাথে ছিল। কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি সাধনা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন আল মাহমুদ।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পূর্বে স্বপরিবারে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে চলে আসেন মীর আবদুর রব।
১৯৫২ সালে আল মাহমুদ নিয়াজ মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকাতে চলে আসেন আল মাহমুদ। ছাত্র অবস্থায় তিনি মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলী,রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য পাঠ করে সাহিত্য রচনার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং সাহিত্য রচনা করতে শুরু করলেন।
ঢাকায় এসে সেই সময়ের কবি আব্দুর রশিদ ওয়াসেকপুরি সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলা পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন এর পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডারের কাজ শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে কবি আব্দুর রশিদ ওয়াসেকপুরী কাফেলা পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দিলে আল মাহমুদ সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন।
১৯৫৪ সালে যখন পত্রিকাতে লিখতে শুরু করেন তখন তার বয়স ছিল মাত্র আঠারো বছর। কাফেলা পত্রিকা থেকে শুরু হয়ে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’পত্রিকা,কলকাতার পত্রিকা নতুন সাহিত্য,চতুস্কোণ,ময়ূখ ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত পত্রিকা’কবিতা’এবং কৃত্তিবাসে আল মাহমুদের কবিতা প্রকাশ হতে থাকে। ঢাকা ও কলকাতার পাঠক সমাজে পরিচিত হয়ে উঠে কবি আল মাহমুদ।
১৯৬৩ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন’লোক লোকান্তর’। প্রথম কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমেই স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে নেন তিনি। ১৯৬৬ সালে প্রকাশ করেন কাব্যগ্রন্থ’কালের কলস’।
কাফেলা পত্রিকার চাকরি ছেড়ে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের মফস্বল বার্তা সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত গমন করেন তিনি। অনেকের দাবি সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পর দৈনিক গণকন্ঠ নামক পত্রিকা প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সেই সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে পত্রিকাতে প্রতিবেদন প্রকাশের দায়ে এক বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। কারা ভোগ শেষে তিনি গল্প লেখায় মনোযোগী হন।
১৯৭৫ সালে’পানকৌড়ির রক্ত’নামে ছোট গল্প প্রকাশ করেন তিনি। সেই সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবি আল মাহমুদকে শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহ পরিচালক পদে নিয়োগ দেন।  ১৯৯৩ সালে তিনি পরিচালক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। সৈয়দা নাদিরা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের জনক- জননী এই দম্পতি। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত’সোনালী কাবিন’পাঠক সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।  ১৯৭৬ সালের’মায়াবী পর্দা দুলে ওঠে’এই কাব্যগ্রন্থ- গুলো কবিকে কবি সমাজে প্রথম সারিতে প্রতিষ্ঠিত করে।
কবি আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার নগর কেন্দ্রে বসবাস করেও তার রচনার ভেতর যে লোকজ শব্দ প্রয়োগ করেছেন এই বিষয়টি তার অনন্য কীর্তি।  ভাটি বাংলার জনজীবন,চরাঞ্চলের জীবন প্রবাহ,নদী নির্ভর জনপদ,গ্রামীণ আবহ,প্রেম ও বিরহ এই বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে নারী ও প্রেমের বিষয়টি তার কবিতায় ব্যাপকভাবে এসেছে। নারীর যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা ও লালশাকে শিল্পের অংশ হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি।
১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় কবির প্রথম উপন্যাস’কবি ও কোলাহল’।
মানুষ হিসেবে কবি ছিলেন নিরহংকারী। ১৯৯৭ সালে কবির সাথে আমার প্রথম পরিচয়। ১৯৯৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার কাইতলা যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে যখন নবম শ্রেণীতে পড়ালেখা করি সেই সময়ে এলাকার তরুণ সাহিত্য প্রেমীদের নিয়ে গঠন করেছিলাম উন্মুক্ত সাহিত্য সংগঠন। সেই থেকে স্কুলের দেয়ালে প্রতিমাসে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করে আসছিলাম। ১৯৯৭ সালে আলিমুদ্দীন জোবেদা (অনার্স) কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় “নব সাহিত্যের পাতা”নামে একটি সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ করতে শুরু করেছিলাম। সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আমাকে।
দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশের সময় কবির সাথে আমার পরিচয়। তখন তিনি দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক। ১২১৭ নং বড় মগবাজারের অফিসে বসেন তিনি।
কবি জামশেদ ওয়াজেদ কখনো কবি হয়ে ওঠেননি। “নব সাহিত্যের পাতা”দ্বিতীয় সংখ্যায় তার একটি কবিতা ছাপানোর জন্য আমার হাতে তুলে দিয়েছেন মাত্র।
জামশেদ ওয়াজেদ তখন বড় মগবাজারে থাকতেন।  এক দুপুরে জামশেদকে সাথে নিয়ে দৈনিক সংগ্রাম অফিসে চলে গেলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কেউ কবির সাথে দেখা করতে এসেছে জানামাত্র আমাদের চেম্বারে ডেকে নিলেন।
শান্ত ও সুন্দর চেহারার মানুষটি ভারী কাঁচের চশমা পরে মায়াবী চোখে তাকিয়ে আছেন। সালাম দিয়ে সামনে দাঁড়ালাম দুজন। টেবিলের সামনে খালি চেয়ারে আমাদের বসার আমন্ত্রণ জানালেন। চেয়ারে বসার পড়ে তিনি আমাদের পরিচয় জানলেন। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে কবি বললেন-তুমি তো আমার নাতি হও!
কবির মুখ থেকে নাতি শব্দটি শুনে আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছিলাম। এই বয়সে একটি সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ করছি জেনে খুব খুশি হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিল্প সাহিত্যের আলো তোমারা ই জ্বেলে রাখবে!
আমরা দু’জন  চা পান শেষ করতে করতে”নব সাহিত্যের পাতার”জন্যে একটি শুভেচ্ছা বাণী লিখে টেবিলের কাঁচের নিচ থেকে একটি সাদা-কালো ছবি বের করে বাণী লিখা কাগজ ও ছবিটি আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন -আজ থেকে যখন প্রয়োজন বোধ করবে দাদার কাছে চলে এসো।
এরপর থেকে প্রায় সময় কবির সাথে দেখা করতে গিয়েছি ওনার অফিসে। কবিকে কখনো দাদা কখনো নানা বলে সম্বোধন করতাম। যখন দাদা কিংবা নানা বলে সম্বোধন করতাম খুশিতে গালের চামড়ায় ভাঁজ পড়তো। মাঝে মধ্যে রিক্সায় চড়ে বিভিন্ন গুণীজন ও বিভিন্ন স্থানে নিয়ে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতেন। এক বিকেলে বিশ মিনিটের মধ্যে হাতের কাজ শেষ করে দাঁড়িয়ে বললেন-চলো আজ তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাব!
অফিসের গেইটের সামনে রিক্সা নিয়ে এক ড্রাইভার দাঁড়িয়েছিল।কাছাকাছি এসে নরম সুরে রিক্সার ড্রাইভারকে বললেন-পুরানা পল্টন যাবেন ?
রিক্সার ড্রাইভার জবাব দিলেন ওঠেন স্যার!
দাদা নাতি দুজন রিক্সায় চেপে বসলাম। যেতে যেতে রাস্তার দু’পাশে আঙ্গুল তুলে বিশ-পঁচিশ বছর পূর্বের স্মৃতি আওড়াচ্ছেন তিনি। পুরানা পল্টন হারুন ডায়েরীর কাছাকাছি এলে রিক্সা ড্রাইভার কে থামতে বললেন।
ভাড়া পরিশোধ করে নেমে পড়লাম। হারুন ডাশেরীর সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন কবি। আমিও পিছু পিছু যাচ্ছি। দো’তলার দরজা ঠেলে এক রুমে প্রবেশ করলেন । উঁচু চেয়ারে বসে আছেন দীর্ঘ দেহী লম্বা চুলের কবীর বয়সী একজন।
কবিকে দেখে চেয়ারে বসা জন হেসে বললেন-এতদিন পড়ে আসতে মনে চাইলো ?
কবি জবাব দিলেন-মনে তো চায় প্রতিদিন আসি, কিন্তু——-! এই বলে থেমে গেলেন তিনি ।
চেয়ারে বসা জনকে আমি সালাম দিলাম।
আমার দিকে তাকিয়ে কবি কে জিজ্ঞেস করলেন- আপনার কি হয় ?
কবি হেসে জবাব দিলেন ও আমার নাতি।
নাতির নাম কি?
নাতির নাম শাহীন।
নাম শোনার সাথে সাথে চেয়ারে বসা জন ও বাবারে!  বলে দাঁড়িয়ে গেলেন।
কবি হেসে বললেন-শান্ত হয়ে বসুন,আমার নাতি আপনার চোখ নেবে না!
চেয়ারে বসে তিনি বললেন-আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আপনার নাতি একদিন আমাদের শিকার করবে! আমার কাঁধে হাত রেখে কবি আল মাহমুদ চেয়ার দেখিয়ে বললেন-বসো!
আমরা দুজন সামনের চেয়ারে বসলাম। কবি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-উনাকে চিনো ?
দু’দিকে ঘাড় বাঁকালাম।
উনি তোমাদের নবীনগরের কবি ফজল শাহাবুদ্দিন।  এইভাবে বিভিন্ন গুণীজনদের সাথে আমার পরিচয় করিয়েছেন কবি আল মাহমুদ । এক বিকেলে কবির  চেম্বারে বসে চা পান করছি দু’জন। এক চুমুক গিলে কৌতুহল নিয়ে বললাম -দাদা একটি বিষয় আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে!
কি বিষয় দাদা ? তিনি প্রশ্ন করলেন।
প্রথম দেখাতেই বলেছিলেন আমি আপনার নাতি হই! আমার চেহারা কি আপনার কোন নাতির সাথে মিল রয়েছে ?
চায়ের কাপ টেবিলে রেখে বললেন-আমার পিতৃপুরুষদের বাড়ি তোমার গ্রামে!
চমকে জিজ্ঞেস করলাম-কিভাবে ? কেউ কেউ বলে আপনার দাদা হবিগঞ্জ জেলার জমিদার ছিলেন!
কবি হেসে জবাব দিলেন-সারাদেশে ই আমার বংশধরেরা রয়েছে! তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার কাইতলা মীর বাড়ি হলো আমার পিতৃপুরুষদের বাসস্থান। মীর বাড়ি থেকে কাইতলা জমিদার বাড়িটি বেশি দূরে ছিলোনা। পিতামহ মীর  আবদুল ওহাব একজন কবি ছিলেন। তিনি জারি গান লিখতেন। আরবি,ফারসি ও সংস্কৃত ভাষা জানতেন তিনি । স্থানীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন তিনি।  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইলের ব্যবসায়ী মাক্কু মোল্লার কন্যাকে বিয়ের সুবাদে মৌড়াইলের মোল্লাবাড়িতে স্থায়ী হন আমার পিতামহ মীর আবদুল ওহাব।
এর পরের বংশধরেরা সকলেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইলের অধিবাসী।
কবির সাহিত্য জীবন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কবিতা, গল্প,উপন্যাস,আত্মজীবনী,কিশোর সমগ্র,রূপকথা ও মহাকাব্য মিলিয়ে প্রায় ৪২ টি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি।
লোক লোকান্তর,কালের কলস,সোনালী কাবিন,মায়াবী পর্দা দুলে ওঠে,আরব্য রজনী রাজহাঁস,বখতিয়ারের ঘোড়া,অদৃশ্যবাদীদের রান্নাবান্না,কাবিলের বোন, Selected Poems Al Mahmud, দিন যাপন,দ্বিতীয় ভাঙ্গন,একটি পাখির লেজ ঝোলা,পাখির কাছে ফুলের কাছে,আল মাহমুদের গল্প,গল্প সমগ্র,প্রেমের গল্প, যেভাবে বেড়ে উঠি,কিশোর সমগ্র,কবির আত্মবিশ্বাস, কবিতা সমগ্র,কবিতা সমগ্র ২,পানকৌড়ির রক্ত, সৌবভের কাছে পরাজিত,গন্ধবণিক,ময়ূরীর মুখ, না কোন শূন্যতা মানি না,নদীর ভেতরের নদী,পাখির কাছে ফুলের কাছে,প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা,প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা,প্রেমের কবিতা সমগ্র,উপমহাদেশ,বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ,উপন্যাস সমগ্র-১,উপন্যাস সমগ্র-২, উপন্যাস সমগ্র-৩,  তোমার গন্ধে ফুল ফুটেছে,ছায়ায় ঢাকা মায়ার পাহাড়,ত্রিশেরা, ওড়াল কাব্য,এ গল্পের শেষ নেই শুরু ও ছিল না,এক চক্ষু হরিণ।
এই সকল গ্রন্থের মাধ্যমে বাংলার সাহিত্য অঙ্গনে অমর হয়ে আছেন কবি আল মাহমুদ। কবিতা অঙ্গনে আজও তিনি আধুনিক কবিতার বরপুত্র।
বেশ কিছু সম্মাননা ও পুরস্কারের অধিকারী তিনি।
১৯৬৮ সালে তিনি বাংলা একাডেমীর সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭২ সালে জয় বাংলা পুরস্কার,সেই সালেই জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার এবং কবি জসীমউদ্দীন পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে  ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার এবং একুশে পদক।  ১৯৯০ সালে নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক। ১৯৯৫ সালে ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার। ২০০৪ সালে ভানু সিংহ সম্মাননা পদক। ২০১১ সালে লালন পুরস্কার। ২০১৭ সালে বাসাসপ কাব্যরত্ন। ২০২৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী তারিখে ৮২ বছর বয়সে ধানমন্ডি ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নিরহংকারী কবি আল মাহমুদ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দক্ষিণ মৌড়াইলের কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন আধুনিক কবিতার বরপুত্র কবি আল মাহমুদ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  
আরও পড়ুন
r57 shell c99 shell pendik escort istanbul escort
অনুবাদ করুন »