নতুন মাত্রা পত্রিকার অনলাইন ভার্সন (পরীক্ষামূলক সম্প্রচার)

 ঢাকা      রবিবার ১৪ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১লা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

‘কৃষ্ণনগরের কৃষ্ণকেশী’র ‘বেহিসেবি রঙ’ …….হিমাদ্রিশেখর সরকার

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ২:২৪ অপরাহ্ণ , ১ এপ্রিল ২০২৪, সোমবার , পোষ্ট করা হয়েছে 2 weeks আগে

‘কৃষ্ণনগরের কৃষ্ণকেশী’র ‘বেহিসেবি রঙ’
………হিমাদ্রিশেখর সরকার

কবিরা এ সমাজেরই মানুষ। তারপরও কোথায় যেন আর দশটা মানুষের সাথে তাদের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এ ভিন্নতা মনে হয় তাদের চিন্তা-চেতনায় ও তা প্রকাশের মধ্যে। তাদের আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্খা, পাওয়া-না পাওয়া, বাদ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধ একটু ভিন্নতা নিয়ে প্রকাশিত হয়। তারা নিজের কথা নিজেরাই, নিজেদের ভাষায় বলেন। তারা তাদের কথা লেখায় বলেন, রেখায় বলেন। যা অন্যেরা পারেন না। তাই কবিদের আমরা ‘একটা বিশেষ জাতের মানুষ’ বলতেই পারি। বলা অন্যায় হবে না হয়তো।

আমাদের একজন তরুণ কবি নুসরাত জাহান জেরিন তার মনের ভাব-অভাব প্রকাশ করেছেন কবিতার ভাষায়। তার সে ভাষা কাব্যগুণ-সমৃদ্ধ। তার কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছেন ‘বেহিসেবি রঙ’। এটি তার প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থবদ্ধ কবিতাগুলো পড়ার আগেই এ কবির কিছু ‘খুচরা কবিতা’ পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু তার ছাপানো কাব্যগ্রন্থটি পড়ে মনে হয়েছে প্রথম গ্রন্থেই তিনি ‘বাজিমাত’ করেছেন। বইয়ের কবিতাগুলোকে আমার কাছে কাব্যময় মনে হয়েছে। তার কবিতা আবোল-তাবোল কথার ফুলঝুরি নয়। কবিতার বিষয়বস্তু অর্থবহ। মনে হয়েছে ইতোমধ্যে এ তরুণ কবি কবিতায় তার একটি ‘নিজস্ব কাব্যভাষা’ আয়ত্ত করে ফেলেছেন। সাধারণত প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থে কবিদের এতোটা পরিপক্কতা আসে না। তরুণ কবি নুসরাত জাহান জেরিন-এর কবিতা আমাদের চিন্তার খোরাক দিয়েছে। তাই তার ‘বেহিসেবি রঙ’ নিয়ে কিছু ‘বেহিসেবি কথা’ বলতেই হচ্ছে।

‘বেহিসেবি রঙ’ পাঁচ ফর্মার একটি কাব্যগ্রন্থ। এতে কবিতা আছে ৭৯টি। কিছু কিছু কবিতা আছে আবার ২ থেকে ৬ লাইনের। এগুলোকে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘কবিতিকা’ বলা যায়। এ কবিতিকাগুলো অনেক সুন্দর অর্থ বহন করে। যা মুখস্ত করে রাখার মতো। যদিও এগুলো কবির একান্ত ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখই প্রকাশ করেছে। এখানে একটি কবিতিকা তুলে দিচ্ছি-‘আমি দুঃখবিলাসী/ দিনশেষে দুঃখকে পুঁজি করে হাসি/বেশ আছি দুঃখ পুঁজি করেই বাঁচি। -(‘দুঃখবিলাসী’, পৃষ্ঠা-৫৫)। বইটিতে এমন অনেক কবিতাই আছে যার অনেক লাইন উদ্ধৃতিযোগ্য। সুন্দর, সাবলীল নুসরাতের কাব্যভাষা। যেন তিতাস নদীর তরতর করে বয়ে চলা শান্ত্ স্রোত। যা পড়তে পড়তে পাঠক ক্লান্ত বা বিরক্ত হবেন না। নুসরাতের কবিতায় যে বিষয়টি লক্ষ্যণীয় তা হলো তার কবিতায় কোন দুর্বোধ্য শব্দ বা বিষয় নেই। সকল শ্রেণীর পাঠকই ‘বেহিসেবি রঙ’ পড়ে আনন্দ পাবেন। বিভ্রান্ত বা আশাহত হবেন না।

কবিতাগুলো পড়ে বোঝা যায় ‘বেহিসেবি রঙ’-এ শব্দবন্ধটি কবির খুব প্রিয়। তাই কবিতায় ‘বেহিসেবি রঙ’ শব্দবন্ধটি বার বার ব্যবহার করেছেন । বইয়ের নামও দিয়েছেন ‘বেহিসেবি রঙ’। সৌভাগ্যক্রমে কবি ‘তিতাস পাড়ের মেয়ে’। তিতাসের পাড়ে নবীনগর উপজেলার বিখ্যাত কৃষ্ণনগর গ্রামে কবির জন্ম। কবি তার নিজের পরিচয় দিয়েছেন তার কাব্যভাষায়-‘আমি কৃষ্ণগাঁয়ের কৃষ্ণকন্যা’। কবি জন্মগ্রামকে ভুলেননি। ভুলেননি শৈশবের ‘দাপাদাপি’র সেই ‘পাগলা নদী’কে। কবি সযতনে লালন করে চলেছেন তার শৈশবের স্মৃতি ও কৃতিকে। কৈশোরের সেই বিদ্যালয়, ‘পিতলের ঘন্টাধ্বনি’ বার বার কবির কানে বাজে। ‘পিতলের ঘন্টা হাতে সামনে দাঁড়িয়ে প্রাণেশদা, ‘আরে ক্যামন আছো?’(‘খোলা মাঠটিতে’, পৃ.-৬৫)।

তরুণ-তরুণীর কবিতায় প্রেম-ভালোবাসার কথা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। জৈবিক ভালোবাসাকে কোন বয়সই অস্বীকার করতে পারে না। তাই তার ‘বেহিসেবি রঙ’-কে তিনি রাঙিয়েছেন অনেক প্রেমের কবিতায়। যেগুলো একান্তই তার ব্যক্তিগত। এখানে ব্যর্থতা আছে, উচ্ছ্বাস আছে, আছে লুকানো বেদনা আর গোপন সুখ । থাকাটাই বাস্তব^। না থাকাটাই অবাস্তব। তার প্রেমের কবিতা ‘অপেক্ষার পরাগ’-এ কবি বলছেন- -‘তবু তুমি আসলে না, তোমার আসা হলো না/অথচ আসবে বলে-/অপেক্ষার পরাগ মেখে/একাকী বসে থাকি/যাবজ্জীবন কারাবন্দির মতো আঁধার সেলে/ চোখের জলে অসহায়ত্বের ধূম্রজালে/ আমি ভীষণ একা, পাশে শুধুই পড়ে আছে/আমার অলিখিত কবিতার শব্দরা (শব্দেরা?)(পৃ.-৫২)। তার ‘কাবিনবিহীন’ কবিতাটি প্রেমের কবিতার জগতে এক সাহসী সংযোজন। প্রেমিকের কাছে তিনি ‘কাবিনবিহীন দুটি হাত’ কামনা করছেন। ‘মৃত্যুর মতোন রোজ আসে যদি বাঁধভাঙা আঘাত/ তখন ভরসার বৃক্ষ হয়ে দেবে কি ছায়া?/ আমাকে মুক্ত করতে আমারই শিকলপরা হাতে/ রাখবে কি তোমার ওই কাবিনবিহীন দুটি হাত/।’(পৃ.-২৬)
প্রেমের বাস্তবতার কাছে কবি বার বার হাত পেতেছেন এবং নতজানু হয়েছেন। নিজেকে একজন প্রেমিক কবি বলে প্রতিষ্ঠিত করার তীব্র প্রয়াস পেয়েছেন। । তাই বলে কবি নুসরাত জাহান জেরিন ব্যক্তিগত প্রেমের আঙিনায় বেহিসেবি রঙ মেখে আটকা পড়ে থাকেন নি। কবিতায় তিনি সমষ্টির হয়ে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন নারীর চিরাচরিত বঞ্চনা নিয়ে । সমাজের বিভিন্ন অন্যায়-অসঙ্গতি নিয়ে তিনি কবিতায় সোচ্চার হয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘প্রতিবাদই কবিতা’(পৃ.-৩২)। কবির ভাষায়- ‘আঙুলের ডগায় যে শব্দরা (শব্দেরা ?) নিশপিশ করে/সেই শব্দেরাই কলমের কালিতে অক্ষর হয়ে /জোরালো প্রতিবাদে, কবিতা হয়ে ওঠে।/’

কবি জেরিনের প্রিয় চরিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর প্রতিবাদী নারী বাসন্তী। তাই তার কবিতায় তিতাস, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, ঋত্বিক এবং ‘তিতাস’- এর চরিত্ররা এসেছেন। ‘তামুকের ধোঁয়ায় উড়ে মালোদের দুঃখ পুড়ে কিনা’ – এ প্রশ্ন কবির। উত্তর দেবে কে ? লোভী ভূমিদস্যুদের থাবায় তার প্রিয় তিতাস যে আজ হারিয়ে যাচ্ছে এ নিয়ে কবির বেদনাবোধের চরম প্রকাশ তার কবিতার পরতে পরতে আছে। সমাজের সকল ধরণের অন্যায়-অবিচার আর অব্যবস্থার বিরুদ্ধে তারাই দাঁড়ান আসলে যারা প্রকৃত কবি। তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে পারেন না। কবি জেরিনও এর ব্যতিক্রম নন। যিনি প্রকৃত কবি তিনি প্রকৃতি আর মানুষকেও ভালোবাসেন । প্রকৃতি আর মানুষ একে অন্যের পরিপূরক। প্রকৃত কবির কাব্যভাষায় কোন প্রকারের সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই। আমাদের আশার কথা, ভরসার জায়গা যে আমাদের আলোচ্য কবি নুসরাত জাহান জেরিন তার কবিতায় সাম্প্রদায়িকতামুক্ত। এখানে আরেকটি বিষয় আমাদের দৃষ্টি এড়ায়নি। তা হলো কবি তার প্রথম কাব্যগ্রস্থ প্রকাশে তার আপনজনদের বিশেষ করে দাদা-দাদি, মা-বাবা এবং তাকে অনুপ্রেরণা-দানকারী শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন এবং পরিবারের বাইরে তার একজন শ্রদ্ধেয় মানুষকে বইটি উৎসর্গ করেছেন। এ উদার মানসিকতার জন্য কবির ধন্যবাদ প্রাপ্য।

‘বেহিসেবি রঙ’ এর কবির কবিতায় উপমা ও চিত্রকল্পের প্রয়োগ খুব সুন্দর। যদিও কবি বিশুদ্ধ ‘ছন্দের বারান্দায়’ হাঁটেননি। তবে তার গদ্য কবিতায়ও এক ধরণের নিজস্ব ছন্দের দোলা আছে। যা কাব্যরসিক মাত্রেই অনুভব করতে পারবেন, ধরতে পারবেন। তবে ভবিষ্যতে কবিকে ছন্দ নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নামতে হবে এবং বড় বড় কবিদের অনেক কবিতা পড়তে হবে। কারণ তিনি একজন প্রতিশ্রতিশীল সম্ভাবনাময় কবি। যা আমাদের মননে স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছে। আমাদের আশা এ তরুণ কবি একদিন বাংলা সাহিত্যের জগতে (গদ্য-পদ্য উভয়) স্থান করে নেবেন তার চর্চা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে।

‘বেহিসেবি রঙ’ এর প্রচ্ছদ, বাধাঁই, কাগজ ও ছাপার মান ভালো। জলরঙে আকাঁ আশরাফ পিকোর প্রথম প্রচ্ছদ হৃদয়গ্রাহী। শেষ প্রচ্ছদ ‘আকাশ নীল’ খুবই দৃষ্টিগ্রাহ্য। তবে বইয়ের ভিতরের কিছু ভুল বানান সম্পর্কে কথা না বলে পারছি না। ‘ধিক্কার’ কবিতায় (পৃ.-২৩) আছে ‘আত্মচিৎকার’, এটি হবে আর্তচিৎকার। ক্রিয়াবিশেষ্য ‘চাই’-কে ‘চায়’ লেখা, খাই-কে খায় (যেমন- আমি ভাত খায়) লেখা-এ জাতীয় ভুল প্রয়োগ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অনেক নবীন কবি-লেখকের লেখায় দুঃখজনকভাবে দেখা যায়। আমাদের এ নবীন কবিও এ আঞ্চলিকতার দোষে দুষ্ট হয়ে আছেন। আশা করি এ ভুলটি তিনি আর কখনও করবেন না। ২৯ পৃষ্ঠায় ‘ধাড়ালো’ হবে ধারালো, ৪৭ পৃষ্ঠায় ‘পুষি’ হবে পুঁজি, ৫৩ পৃষ্ঠায় ‘দিনপুঞ্জি’ হবে দিনপঞ্জি। ‘শব্দরা’ হবে শব্দেরা। বইয়ের শেষদিকে ৭৮ পৃষ্ঠায় ‘দারিদ্রতার’ শব্দটি ভুল প্রয়োগ। অনেকেই এ ভুলটি করেন। সংস্কৃত-দরিদ্র+তা=দরিদ্রতা বা দারিদ্র্য (‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান!’-নজরুল-এর ‘দারিদ্র্য’ কবিতা, কাব্যগ্রন্থ-‘সিন্ধু-হিন্দোল’), দারিদ্রতা নয় কদাপি। আশা করি কবি পরবর্তী সংস্করণে তার ভুলগুলো শুধরে নেবেন।

একজন নবীন কবিকে কবি হয়ে উঠতে হলে তাকে অনুশীলনের মাধ্যমে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে হয়। আশা করি ‘বেহিসেবি রঙ’-এর কবি সে পথেই হাঁটবেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থে কাব্যিক নামের কবি নুসরাত জাহান জেরিন অনেকটাই সফলতা লাভ করেছেন। তবে তিনি এখানেই থামবেন না। আশা করি পরবর্তী কাব্যগ্রন্থে তিনি তার ব্যক্তিগত আবেগ অনেকটাই ঝেড়ে ফেলবেন। কবিতাকে করবেন তিনি তার জীবন-যুদ্ধের হাতিয়ার। কবিতায় ও গদ্যে তিনি মাটি ও মানুষের আরও কাছাকাছি চলে আসবেন। এ শুধু আমাদের প্রত্যাশা নয়, দাবিও।

‘বেহিসেবি রঙ’
নুসরাত জাহান জেরিন
প্রকাশক-‘কারুবাক’
কাঁটাবন, ঢাকা।
০১৭১১-২৬৩৬৯২,০১৯৮৮-৫৭৯৪৪৮
অনলাইন পরিবেশক-www. rokomari.com
প্রকাশকাল-ফেব্রুয়ারি ২০২৪
মূল্য- ২৫০ টাকা, পৃষ্ঠা সংখ্যা-৭৯।
…………………………………………………………………………………….
হিমাদ্রিশেখর সরকার। প্রাবন্ধিক, গবেষক ও ছোটগল্পকার। মোবাইল ০১৭২০২১২৮৫৬। email shekhorhimadri@gmail.com

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

April 2024
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  
আরও পড়ুন
অনুবাদ করুন »